Skip to main content

প্রলয়োল্লাস কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম কেন জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?

প্রলয়োল্লাস কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম কেন জয়ধ্বনি করতে বলেছেন? আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, দশম শ্রেণি, দ্বিতীয় সেমিস্টার বাংলা।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নি-বীণা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য ও কালজয়ী সৃষ্টি। পরাধীন ভারতের বুকে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন এক নতুন সকাল আনাই ছিল কবির মূল লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে আমরা কবিতাটিতে দেখতে পাই যে-

    ধ্বংসের মধ্য দিয়েই নতুনের আগমন।আসলে কবিতাটির মূল সুর হলো-পুরনো, জরাজীর্ণ, অন্যায় ও অত্যাচারকে ধ্বংস না করলে নতুন এবং সুন্দরের প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।তাই কবি বিশ্বাস করতেন, মহাকালের এই ধ্বংসাত্মক রূপ আসলে সৃষ্টিরই পূর্বাবস্থা।তাই কবি বলেন-

"ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? - প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!"

       অতপঃর কবি রুদ্ররূপী শিব বা বিপ্লবীদের আহ্বান করেছেন।কবি ভারতীয় পুরাণের ধ্বংসের দেবতা মহাদেব বা শিবের 'কালভৈরব' রূপের সঙ্গে তৎকালীন তরুন বিপ্লবীদের তুলনা করেছেন। তরুণেরা যেমন তাদের সাহসিকতা দিয়ে ব্রিটিশদের কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, তেমনি শিবও তাঁর তাণ্ডব নৃত্যে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেন।আর সেখানেই দেখা যায়,ভয়ংকর রূপ।এই ধ্বংস দেখতে ভয়াবহ হলেও তা আসলে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার জন্য।আসলে অত্যাচারীর কারাগার ও শেকল ভেঙে ফেলার জন্য এই রুদ্র রূপের প্রয়োজন। আর সেখানে কবির কন্ঠে শুনতে পাই 

"ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।তোরা সব জয়ধ্বনি কর!"

     আলোচ্য কবিতায় জরাজীর্ণ ও সুন্দরের মেলবন্ধন করা হয়েছে। আসলে সমাজে যা কিছু মৃতপ্রায়, অন্যায়, শোষিত এবং পরাধীন, তাকে ঝেটিয়ে বিদায় করার জন্য ‘মহাকাল’ আসছেন। তিনি একদিকে যেমন সংহারক (ধ্বংসকারী), অন্যদিকে তেমনি রক্ষাকর্তা।আর সেই রক্ষাকর্তা যুগের পর যুগ ধরে চলা অন্যায়কে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দিতে এই প্রলয় আসছে।আর সেখানে ধ্বংসের শেষে যে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে, তা হবে সুন্দর ও শৃঙ্খলিত।

"আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশা নৃত্য-পাগল,

সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।"

        অতঃপর কবিতার শেষে আমরা শুনতে পাই-আশাবাদ ও তরুণের জয়গান। যেখানে নজরুল এই কবিতায় চরম আশাবাদী। তিনি পরাধীন দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই ঝড়ের শেষে অন্ধকার কেটে যাবে এবং স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠবে। তাই ভয় না পেয়ে সবাইকে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে বলেছেন।

      পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা এবং তরুণদের মধ্যে বিপ্লবের আগুন জ্বালানো। ধ্বংস হলো সৃষ্টির সূচনা। অন্যায়কে ধ্বংস করতেই রুদ্ররূপী বিপ্লবীদের আগমন ঘটছে। অত্যাচারী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সত্য ও সুন্দরের জয় অবশ্যম্ভাবী। তাই ভীতি দূর করে সবাইকে জয়ের গান গাইতে হবে-

            "তোরা সব জয়ধ্বনি কর!"


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...