দেনাপাওনা’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিরুপমার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। অথবা, পনপ্রথার নির্মম শিকার হিসেবে নিরুপমার যে ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটেছে, তা আলোচনা করো।
'দেনাপাওনা’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিরুপমার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। অথবা, পনপ্রথার নির্মম শিকার হিসেবে নিরুপমার যে ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটেছে, তা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS-14,Unit-I.
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত ‘দেনাপাওনা’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ও বাস্তবধর্মী সামাজিক ছোটগল্প। উনিশ শতকের শেষার্ধের বাঙালি হিন্দু সমাজে জাঁকিয়ে বসা ব্যাধি ‘পনপ্রথা’ বা যৌতুকপ্রথার অমানবিক রূপ এবং তার নির্মম বলি হওয়া এক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন তরুণীর বেদনাময় আখ্যানই এই গল্পের মূল উপজীব্য। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নিরুপমা পনপ্রথার অবমাননাকর রূপ ও শ্বশুরবাড়ির লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ দৃঢ় প্রতিরোধের প্রতীক। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই-
নিরুপমা ছিল তার পিতা রামসুন্দর মিত্রের অত্যন্ত আদরের কন্যা। তৎকালীন সমাজ-নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ হাজার টাকা নগদ এবং প্রচুর আসবাবের বিনিময়ে রায়বাহাদুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পুত্র সাথে তার বিয়ে স্থির হয়। কিন্তু দরিদ্র পিতা রামসুন্দর বিয়ের দিন প্রতিশ্রুত পণের পুরো টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। ফলে বিয়ের লগ্ন থেকেই নিরুপমার জীবনে নেমে আসে লাঞ্ছনা ও অপমানের কালো ছায়া। শ্বশুরবাড়িতে পা রাখামাত্রই তাকে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে থাকতে হয়। শুধু তাই নয়-
শ্বশুরবাড়ির নির্মম নির্যাতন ও অবমাননা নিরুপমা কে সহ্য করতে হয়।যৌতুকের বকেয়া তিন হাজার টাকার অপরাধে নিরুপমার ওপর নেমে আসে তীব্র মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার। বিশেষ করে তার শাশুড়ি ও শ্বশুর রায়বাহাদুরের বাক্যবাণ এবং অবহেলা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। কিন্তু এই চরম অপমানের মধ্যেও নিরুপমা ধৈর্য হারায়নি বা পিতার দারিদ্র্যের কথা ভেবে লজ্জায় ভেঙে পড়েনি। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যখন তার পিতৃবংশকে কটাক্ষ করত, তখন সে নীরবে তা সহ্য করলেও মনে মনে এক তীব্র ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছিল। ভাবছি কারণেই-
আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণ ও দৃঢ় প্রতিরোধ নিরুপমার মনে বাসা বাঁধে। আসলে গল্পের মোড় ঘোরে তখন, যখন রামসুন্দর নিজের বসতবাড়ি বিক্রি করে পণের বাকি টাকা জোগাড় করে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আসেন। নিরুপমা বুঝতে পেরেছিল, এই টাকা দেওয়ার অর্থ হলো তার পিতার সর্বস্বান্ত হওয়া এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা। এই পর্যায়ে এসে নিরুপমার শান্ত ও বাধ্য চরিত্রটির খোলস ভেঙে এক তেজস্বী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রূপ প্রকাশ পায়। সে দৃঢ়স্বরে তার পিতাকে টাকা দিতে নিষেধ করে বলে-
"এ টাকা যদি দাও তবেই তোমার মেয়ের অপমান। তোমার মেয়ে কি কেবল কতকগুলো টাকার থলি যে যতক্ষণ টাকা দেবে ততক্ষণ তার মর্যাদা!"
এই উদ্ধৃতিটি প্রমাণ করে যে, নিরুপমা নিজেকে কেবল এক টুকরো পণ্য বা ‘টাকার থলি’ হিসেবে দেখতে রাজি ছিল না। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক।আসলে-
স্বামীর উদাসীনতা ও নিঃসঙ্গতা নিরুপমার ট্র্যাজেডি আরও গভীর হয় তার স্বামীর নিষ্ক্রিয়তায়। নিরুপমার স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হলেও, পারিবারিক কর্তৃত্ব ও মায়ের অন্ধ আনুগত্যের কারণে সে ছিল মেরুদণ্ডহীন একটি চরিত্র।সে নিরুপমাকে ভালোবাসলেও তার ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস দেখাতে পারেনি। স্ত্রীর অসুস্থতার সময়েও সে মায়ের আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে পারেনি। এই নিঃসঙ্গতা ও মানসিক যন্ত্রণা নিরুপমাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। আর সে কারণেই-
করুণ পরিণতি বা ট্র্যাজেডি নেমে আসে নিরুপমার জীবনে।আসলে ক্রমাগত অবহেলা, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব এবং শীতের দিনে চরম অযত্নের কারণে নিরুপমা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু তার চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। অবশেষে একদিন সমস্ত লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে নিরুপমা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। তার মৃত্যুর পর রায়বাহাদুরের পরিবার সামাজিক লোকদেখানো আভিজাত্য বজায় রাখতে অত্যন্ত ধুমধাম করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলতে লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-
"খুব ধুমধাম করিয়া অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হইল। এমন চন্দনকাষ্ঠের চিতা, এমন সমারোহ এ অঞ্চলে কেহ কখনো দেখে নাই।"
রবীন্দ্রনাথ এই তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, জীবদ্দশায় যে মেয়েটি এক ফোঁটা ওষুধ বা আদর পায়নি, মৃত্যুর পর তার মৃতদেহকে ব্যবহার করে সমাজ কীভাবে নিজের মেকি অহংকার বজায় রাখে।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে বলা যায় যে, নিরুপমা কেবল পনপ্রথার একজন অসহায় শিকার বা প্যাসিভ ভিকটিম (Passive Victim) নয়। সে নিজের জীবনের বিনিময়ে পনপ্রথার কুৎসিত রূপকে সমাজের সামনে উন্মোচিত করে গেছে। তার ট্র্যাজিক মৃত্যু আসলে পনপ্রথার নিষ্ঠুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ। তাই ‘দেনাপাওনা’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে নিরুপমা আজীবন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, তেজস্বী ও অবিস্মরণীয় নারী চরিত্র হয়ে থাকবে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR ৯৫৪৭২১০৮৩০.
Comments
Post a Comment