Skip to main content

রসময়ীর রসিকতা' গল্পটির নামকরণ কতটা সার্থকতা লাভ করেছে তা আলোচনা করো। (রসময়ীর এই রসিকতা কি কেবলই পরিহাস, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সত্য লুকিয়ে ছিল- আলোচনা করো।

রসময়ীর রসিকতা' গল্পটির নামকরণ কতটা সার্থকতা লাভ করেছে তা আলোচনা করো। (রসময়ীর এই রসিকতা কি কেবলই পরিহাস, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সত্য লুকিয়ে ছিল- আলোচনা করো। (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS14,Unit-III.)

      আমরা জানি যে,সাহিত্যে নামকরণের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নামকরণ সাধারণত বিষয়াশ্রয়ী, চরিত্রপ্রধান কিংবা ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে থাকে। কথাসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রসময়ীর রসিকতা’ গল্পটির নামকরণ আপাতদৃষ্টিতে চরিত্র ও বিষয়প্রধান মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ জীবনসত্য ও মর্মস্পর্শী ট্র্যাজেডি। রসিকতার মোড়কে কীভাবে একটি দাম্পত্য জীবনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও অপূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বিচার করলেই এই নামকরণের সার্থকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।আর সেখানে-

        গল্পের নামকরণের পটভূমি ও রসময়ীর ‘রসিকতা’য় আমরা দেখি যে,গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রসময়ী ও গৌরকিশোরের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত গতানুগতিক। গৌরকিশোর বৈষয়িক, গম্ভীর এবং কিছুটা উদাসীন প্রকৃতির মানুষ; অন্যদিকে রসময়ী চঞ্চল, কৌতুকপ্রিয় এবং অন্তরে স্বামীর নিবিড় সান্নিধ্যপ্রত্যাশী। স্বামীর এই ঔদাসীন্য ও গাম্ভীর্যের প্রাচীর ভাঙার জন্য রসময়ী এক অভিনব 'রসিকতা' বা ছলের আশ্রয় নেয়। সে তার নিঃসন্তান জীবনের শূন্যতা ও স্বামীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য নিজের এক কাল্পনিক সতীনের অস্তিত্ব তৈরি করে। বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় সে এক কাল্পনিক সতীনের ঘরকন্না ও স্বামীর প্রতি তার ‘কাল্পনিক’ ভালোবাসার গল্প বানাতে শুরু করে। আর সেখানেই ছিল-

        পরিহাসের অন্তরালে মনস্তাত্ত্বিক সত্য।রসময়ীর এই আচরণ প্রথম দিকে কেবলই পরিহাস বা কৌতুক বলে মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য ও তীব্র অভিমান। রসময়ী ভালো করেই জানত, সোজাপথে সে গৌরকিশোরের মনে তীব্র কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারছে না। তাই সে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে স্বামীর অবদমিত অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিল।গল্পের ভাষায়-

"রসময়ী দেখিল, এ রসিকতায় তাহার স্বামী যেন একটু চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছেন। স্বামীর এই চাঞ্চল্যটুকুর মধ্যেই রসময়ী তাহার নারী-হৃদয়ের পরম তৃপ্তি খুঁজিয়া পাইল।"

         সে দিনের পর দিন এই মিথ্যা সতীনের গল্পকে পল্লবিত করে তোলে, চিঠিপত্রের জাল বোনে এবং গৌরকিশোরের মনে এক অদ্ভুত কৌতূহল ও প্রচ্ছন্ন ঈর্ষার জন্ম দেয়। এই রসিকতা আসলে ছিল স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য এক নারীর আকুল ও মরিয়া চেষ্টা।

   গল্পে উঠে আসে রসিকতার মর্মান্তিক পরিণতি ও গভীর সত্য। আসলে গল্পের চরম সার্থকতা লুকিয়ে আছে এর সমাপ্তিতে, যেখানে এই নিখাদ ‘রসিকতা’ এক চরম ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত হয়। রসময়ীর আকস্মিক মৃত্যুর পর গৌরকিশোর যখন তার শেষ চিঠি এবং সমস্ত গোপন নথিপত্র আবিষ্কার করে, তখন তার চোখের সামনে থেকে সমস্ত কুয়াশা সরে যায়। সে বুঝতে পারে, কোনো দ্বিতীয় নারী বা সতীন কখনোই ছিল না; পুরো বিষয়টিই ছিল রসময়ীর এক নিখুঁত কৌতুক অভিনয়।

        কিন্তু এই আবিষ্কার গৌরকিশোরকে হাসায় না, বরং এক চরম অপরাধবোধ ও শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। যে রসময়ী বেঁচে থাকতে স্বামীর একটুখানি নিবিড় মনোযোগের জন্য ছলের আশ্রয় নিয়েছিল, মৃত্যুর পর সে-ই গৌরকিশোরের সমস্ত মন জুড়ে একাধিপত্য বিস্তার করে। লেখক গল্পের শেষে দেখিয়েছেন-

 "গৌরকিশোর চিঠিখানি বুকে চাপিয়া ধরিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। এতদিনে তিনি বুঝিলেন, রসময়ীর রসিকতা কেবল পরিহাস ছিল না, তাহা ছিল তাঁহার অবহেলার বিরুদ্ধে এক নীরব ও মরণপণ প্রতিবাদ।"

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, গল্পটির নামকরণ কেবল রসময়ীর বাহ্যিক চপলতাকে নির্দেশ করে না। ‘রসিকতা’ শব্দটি এখানে একাধারে হাস্যরস, তীব্র ব্যঙ্গ, গভীর অভিমান এবং পরিশেষে এক মর্মন্তুদ বিষাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রসময়ীর রসিকতা শেষ পর্যন্ত গৌরকিশোরের আত্মোপলব্ধির চাবিকাঠি হয়ে ওঠে।বাহ্যিক পরিহাসের খোলসটি ভেঙে গল্পকার যেখানে এক শাশ্বত দাম্পত্য মনস্তত্ত্ব ও করুণ রসকে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেখানেই এই নামকরণের চরম সার্থকতা। তাই বলা যায়, গল্পটির নামকরণ সর্বতোভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাময় হয়েছে।

 ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...