Skip to main content

প্রলয়োল্লাস কবিতার মূলভাব বা সুর নিজের ভাষায় আলোচনা করো।

প্রলয়োল্লাস কবিতার মূলভাব বা সুর নিজের ভাষায় আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, দশম শ্রেণী, দ্বিতীয় সেমিস্টার।

        কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার মূল সুর হলো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুনের আবাহন, পরাধীনতার বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ এবং যৌবনের জয়গান। কবি একাধারে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন এই কবিতায়।এখানে এই কবিতাটির মূলভাব ও সুরকে কয়েকটি প্রধান দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। আর সেগুলি হলো-

​        •কবিতার মূল সুরটি লুকিয়ে আছে ধ্বংসের ভেতর দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির অমোঘ সত্যে। কবি এখানে সনাতন ধর্মের ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতা শিব বা রুদ্ররূপী মহাকালের তাণ্ডবকে তুলে ধরেছেন। কবি বিশ্বাস করেন, জরাজীর্ণ, মৃতপ্রায় এবং পুরোনো সমাজকে ভেঙে চুরমার না করলে নতুন, সুন্দর এবং পবিত্রমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই তিনি বলেছেন-

​"ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?-প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!"

​          •নজরুল যখন এই কবিতাটি লিখছেন, তখন ভারতবাসী ব্রিটিশ শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এই কবিতায় ‘ঝড়’, ‘মহাকাল’ বা ‘ধূমকেতু’ মূলত পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক।পরাধীন ভারতের বুকে যে বিপ্লবী তরুণরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করছিল না, কবি তাদের মধ্যেই মহাকালের রুদ্ররূপ দেখতে পেয়েছেন। অত্যাচারী ব্রিটিশ রাজের বিনাশ ঘটিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনাই ছিল এই কবিতার অন্যতম রাজনৈতিক সুর।

​         •কবিতাটি কেবল ধ্বংসের হাহাকার নয়, বরং এটি চরম আশাবাদের বাণী শোনায়। কবি জানেন যে, কালবৈশাখীর ঝড় যেমন সমস্ত আবর্জনা উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে প্রকৃতিকে সতেজ করে তোলে, তেমনি এই প্রলয় শেষে আসবে এক সুন্দর, দীপ্তিময় সকাল। অন্ধকারের বুক চিরে আলো আসবেই।তাই কবিকে বলতে শুনি-

​"আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশা নৃত্য-পাগল, / সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।"

​         •কবিতার ছত্রে ছত্রে কবি দেশবাসীকে ‘ভয়’ কাটিয়ে ‘জয়ধ্বনি’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। উনিশবার ব্যবহৃত "তোরা সব জয়ধ্বনি কর!" পঙক্তিটি কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি হলো ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার এবং বিপ্লবীদের স্বাগত জানানোর এক মহা-মন্ত্র।

​       ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার মূল সুরটি আসলে এক চরম সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত-"ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির-সুন্দর।" অর্থাৎ, পুরোনো ও অন্যায়কে ধ্বংস করে নতুনের যে আগমন ঘটে, তা যতই ভয়ংকর হোক না কেন, তা আসলে সুন্দরেরই প্রতিষ্ঠা।এটি একাধারে ধ্বংসের উল্লাস এবং সৃষ্টির আনন্দ-গান।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...