দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: শব্দালংকার ও অর্থালংকারের মূল পার্থক্য
বাংলা কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অলংকারকে যে দুটি মূল ভাগে ভাগ করা হয়, তা হলো শব্দালংকার ও অর্থালংকার। এদের মূল পার্থক্যগুলি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
### ১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য
* **শব্দালংকার:** যে অলংকার শব্দের ধ্বনিগত মাধুর্যের ওপর নির্ভর করে কাব্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তাকে শব্দালংকার বলে। এখানে শব্দের অর্থ প্রধান নয়, শব্দের ধ্বনি বা উচ্চারণই প্রধান।
* **অর্থালংকার:** যে অলংকার শব্দের বাহ্যিক রূপ বা ধ্বনির ওপর নির্ভর না করে, শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থের চমৎকারিত্বের ওপর নির্ভর করে কাব্যকে সুন্দর করে তোলে, তাকে অর্থালংকার বলে।
### ২. শব্দ পরিবর্তনের প্রভাব (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য)
* **শব্দালংকার:** শব্দালংকারে কাব্যে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট শব্দটি বদলে যদি তার কোনো সমার্থক শব্দ বা প্রতিশব্দ বসানো হয়, তবে অলংকারটি **নষ্ট হয়ে যায়**। কারণ এর সৌন্দর্য শব্দটির নির্দিষ্ট ধ্বনির ওপর নির্ভরশীল।
* **অর্থালংকার:** অর্থালংকারে কাব্যের কোনো শব্দ পরিবর্তন করে যদি তার সমার্থক অন্য কোনো শব্দ বসানো হয়, তাহলেও অলংকারটি **নষ্ট হয় না**। কারণ এর সৌন্দর্য অর্থের ওপর নির্ভরশীল, নির্দিষ্ট শব্দের ওপর নয়।
> **তুলনামূলক উদাহরণ:**
> একটি লাইন ধরা যাক: *"কেঁদে কেঁদে কহে কলনাদিনী।"* (এখানে 'ক' ধ্বনির বারবার ব্যবহারে 'অনুপ্রাস' নামক শব্দালংকার হয়েছে)। এখন যদি 'কহে' শব্দের বদলে 'বলে' লেখা হয় (*"কেঁদে কেঁদে বলে কলনাদিনী"*), তবে অলংকারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।
> অন্য একটি লাইন: *"মুখখানি যেন নীল পদ্ম।"* (এটি অর্থালংকার)। এখানে যদি 'পদ্ম' শব্দের বদলে তার সমার্থক শব্দ 'শতদল' বসানো হয় (*"মুখখানি যেন নীল শতদল"*), তাহলেও এর অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না এবং অলংকারটি অক্ষুণ্ণ থাকে।
>
### ৩. ইন্দ্রিয়গত পার্থক্য
* **শব্দালংকার:** এটি মূলত আমাদের **শ্রুতি ইন্দ্রিয় বা কানের** তৃপ্তি সাধন করে। শব্দের ঝংকার বা ধ্বনিসাম্য আমাদের শুনতে ভালো লাগে।
* **অর্থালংকার:** এটি আমাদের **বুদ্ধি, হৃদয় ও কল্পনার** তৃপ্তি সাধন করে। অর্থ অনুধাবন করার পর মনের ভেতর একটি সুন্দর ছবি বা ভাবের জন্ম হয়।
### ৪. শ্রেণীবিভাগের পার্থক্য
* **শব্দালংকার:** এর পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। প্রধান শব্দালংকারগুলি হলো— অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, বক্রোক্তি এবং পুনরুক্তবদাভাস।
* **অর্থালংকার:** এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। সাদৃশ্য, বিরোধ, শৃঙ্খল ইত্যাদি নানা ভাবের ওপর ভিত্তি করে এর বহু ভাগ রয়েছে; যেমন— উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, অপহ্নুতি, ব্যতিরেক, ব্যাজস্তুতি, সমাসোক্তি ইত্যাদি।
### সংক্ষেপে শব্দালংকার ও অর্থালংকারের তুলনামূলক ছক:
| পার্থক্যের বিষয় | শব্দালংকার | অর্থালংকার |
| :--- | :--- | :--- |
| **ভিত্তি** | শব্দের ধ্বনি ও উচ্চারণের ওপর নির্ভরশীল। | শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। |
| **সমার্থক শব্দ প্রয়োগ** | সমার্থক শব্দ বসালে অলংকার নষ্ট হয়ে যায়। | সমার্থক শব্দ বসালেও অলংকার অক্ষুণ্ণ থাকে। |
| **গ্রাহ্য রূপ** | এটি শ্রুতিগ্রাহ্য (কানের আরাম দেয়)। | এটি বুদ্ধিগাহ্য ও ভাবগ্রাহ্য (হৃদয়কে স্পর্শ করে)। |
| **উদাহরণ** | *"আনা দাদারে এনে দে।"* (যমক) | *"মহাভারতের কথা অমৃত সমান।"* (উপমা) |
Comments
Post a Comment