Skip to main content

শেষের কবিতা' উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

'শেষের কবিতা' উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টারের বাংলা মেজর (Major)DS-13

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস সাহিত্যের ইতিহাসে ‘শেষের কবিতা’ একটি কালজয়ী ও অনন্য সৃষ্টি। এটি কেবল একটি উপন্যাস নয়, বরং গদ্যে লেখা এক অপূর্ব লিরিক বা গীতিকাব্য। সাহিত্যে নামকরণের ক্ষেত্রে কখনও চরিত্রের নাম, কখনও ঘটনার ঘনঘটা, আবার কখনও অন্তর্নিহিত ভাববস্তু প্রধান হয়ে ওঠে। ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটির নামকরণ মূলত তার ভাবব্যঞ্জক, কাব্যিক এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা কে নির্দেশ করে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি একটি কবিতার বই, কিন্তু নিবিড় পাঠে বোঝা যায়-এই নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে উপন্যাসের মূল ভাবাদর্শ, নায়ক অমিত রায়ের জীবনদর্শন এবং প্রেমচেতনার চূড়ান্ত পরিণতি।

### নামকরণের যৌক্তিকতা, সার্থকতা ও নান্দনিক উৎস হিসাবে মূলত তিনটি প্রধান স্তরে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আর সেখানে আমরা দেখি-

    ১.উপন্যাসের গঠনগত বা আঙ্গিক দিক, যেখানে আছে গদ্য ও পদ্যের মেলবন্ধন।

    ২. অমিত রায়ের কাব্যিক ব্যক্তিত্ব ও জীবনদর্শন।

     ৩. অমিত ও লাবণ্যের প্রেমের চ্যুতি এবং ‘শেষের কবিতা’র মাধ্যমে তার চূড়ান্ত পরিণতি।

     ১. আঙ্গিকগত সার্থকতা গদ্যের মোড়কে 'কবিতা’ উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষা। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে গদ্যের মাধ্যমে যে সংলাপ ও পরিবেশ রচনা করেছেন, তা পদে পদে কবিতার মতো সুরময়। উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অজস্র কবিতা। অমিত ও লাবণ্যের প্রেমচেতনা কেবল সাধারণ সংলাপে ব্যক্ত হয়নি, তা রূপ নিয়েছে কাব্যে। উপন্যাসের একদম শেষ পরিচ্ছেদে এসে লাবণ্যের লেখা ‘শেষের কবিতা’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি দিয়ে কাহিনীর সমাপ্তি ঘটেছে। অর্থাৎ, একটি কবিতার মাধ্যমেই উপন্যাসের ট্র্যাজিক ও উদাত্ত সমাপ্তি ঘটেছে বলে গঠনগত দিক থেকে এই নামকরণ অত্যন্ত সার্থক।

     ২. অমিত রায়ের ব্যক্তিত্ব ও প্রেমচেতনা।উপন্যাসের নায়ক অমিত রায় একজন অক্সফোর্ডের লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যরিস্টার হলেও মূলত সে একজন কবি এবং স্বভাব-রোমান্টিক। সে প্রথাগত সমাজ ও চেনা নিয়মের বিরোধী। অমিতের কাছে প্রেম কোনো সাংসারিক দাসত্ব বা নিত্যদিনের চর্বিতচর্বণ নয়; তার কাছে প্রেম হলো এক চিরন্তন ব্যাকুলতা। লাবণ্যকে ভালোবেসে সে তার মধ্যে এক অপরূপ কাব্যিক সত্তার সন্ধান পেয়েছিল। অমিতের এই কবি-ব্যক্তিত্ব এবং তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যেভাবে কবিতার ছন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তাতে সমগ্র উপন্যাসটিই যেন অমিতের জীবনের একটি দীর্ঘ কবিতার মতো। আর লাবণ্যর সঙ্গে তার প্রেমের বিচ্ছেদ সেই জীবনেরই ‘শেষের কবিতা’।

    ৩.প্রেমাদর্শের দ্বন্দ্ব এবং নামকরণের মূল ব্যঞ্জনা।রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন প্রেম দু-রকমের হতে পারে-একটি হলো ঘড়ার জলের মতো, যা প্রতিদিনের প্রয়োজনে লাগে; অন্যটি দিঘির জলের মতো, যা প্রতিদিনের গৃহস্থালির কাজে লাগে না, কিন্তু মানুষকে এক মহৎ তৃপ্তি দেয়। অমিত ও লাবণ্যের প্রেম ছিল দিঘির জলের মতো—অনাবিল, আধ্যাত্মিক এবং রোমান্টিক। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, বিয়ের পর এক ছাদের নিচে প্রতিদিন সস্তা সাংসারিকতায় বাঁচতে গেলে তাদের এই প্রেমের রোমান্টিক কান্তি মলিন হয়ে যাবে। তাই তারা পরস্পরকে ভালোবেসেও মিলনের পথে না গিয়ে বিচ্ছেদের পথ বেছে নেয়।

        লাবণ্য অমিতকে মুক্তি দিয়ে শোভনলালকে বিয়ে করতে রাজি হয়, আর অমিত ফিরে যায় কেতকীর কাছে। এই যে মিলনহীন প্রেমের এক শাশ্বত ও মহিমান্বিত রূপ, তার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে লাবণ্যের লেখা শেষ চিঠিতে, যা একটি দীর্ঘ কবিতা। এই কবিতাটিই উপন্যাসের নামকরণের মূল চাবিকাঠি।

     ৪. লাবণ্যের বিদায়ী চিঠি এবং ‘শেষের কবিতা’র অমোঘ বাণী। উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে লাবণ্য অমিতের কাছ থেকে চিরবিদায় নেওয়ার সময় চিঠির বদলে একটি কবিতা পাঠায়। এই কবিতায় লাবণ্য স্বীকার করেছে যে, অমিতের দেওয়া ভালোবাসাই তাকে প্রকৃত অর্থে জাগিয়ে তুলেছে। অমিতের প্রতি তার ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়নি, বরং তা সংসারের মলিনতা থেকে রক্ষা পেয়ে এক অলৌকিক স্তরে উন্নীত হয়েছে। লাবণ্য লিখেছে:

"তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান—

গ্রহণ করেছ যতো ঋণী ততো করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।"

         লাবণ্যের এই বিদায়ী কবিতাই অমিত ও লাবণ্যের প্রেমের শেষ অর্ঘ্য। এই কবিতার মাধ্যমেই উপন্যাসের সমস্ত সুর, সমস্ত দ্বন্দ্ব এবং সমস্ত বেদনা এক পরম শান্তিতে ও সৌন্দর্যে রূপ লাভ করেছে। এই বিদায়ী কবিতাটি ছাড়া উপন্যাসের মূল ভাববস্তু কোনোভাবেই সম্পূর্ণ হতো না।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল একটি চমকপ্রদ নাম দেওয়ার জন্য ‘শেষের কবিতা’ নামটি বেছে নেননি। এই নামটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনসত্য। স্থূল মিলনের চেয়ে যে বিচ্ছেদের প্রেম অনেক বেশি সুন্দর এবং অক্ষয়—উপন্যাসে সেই সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লাবণ্যের জীবনের শেষ কবিতাটি আসলে অমিত ও লাবণ্যের প্রেমের এক অমর এপিটাফ (স্মৃতিলেখ)। কাহিনী, চরিত্র, পরিবেশ এবং দর্শনের এমন অপূর্ব কাব্যিক রূপান্তর বাংলা উপন্যাসে বিরল। তাই সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা' নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক, ব্যঞ্জনাময় এবং রসোত্তীর্ণ।


ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...