Skip to main content

রসময়ী রসিকতা গল্পে গৌরকিশোরের চরিত্র। গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্র গৌরকিশোর। তার স্বভাব, রসময়ীর রসিকতায় তার প্রতিক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত তার যে মানসিক রূপান্তর ঘটেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।

রসময়ী রসিকতা গল্পে গৌরকিশোরের চরিত্র। গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্র গৌরকিশোর। তার স্বভাব, রসময়ীর রসিকতায় তার প্রতিক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত তার যে মানসিক রূপান্তর ঘটেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS14, Unit-III.

        কথাসাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রসময়ীর রসিকতা’ গল্পের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল চরিত্র হলো গৌরকিশোর। গল্পকার তাকে কোনো প্রথাগত রোমান্টিক নায়ক হিসেবে চিত্রিত করেননি; বরং তিনি তাকে গড়ে তুলেছেন উনিশ শতকীয় বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের এক বাস্তববাদী, বৈষয়িক এবং আবেগহীন পুরুষ-প্রতিনিধি হিসেবে। গল্পের শুরুতে গৌরকিশোরের যে স্থূল ও গম্ভীর রূপটি দেখা যায়, স্ত্রীর মৃত্যুর পর এক চরম অপরাধবোধ ও ট্র্যাজিক আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে তার যে মানসিক রূপান্তর ঘটে, তা-ই এই চরিত্রটির মূল আকর্ষণ।আর সেখানে-

​      গৌরকিশোরের এই মানসিক রূপান্তরকে মূলত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে

​       •প্রথম পর্যায়ঃগল্পের সূচনায় গৌরকিশোর একজন অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং রোমান্সহীন মানুষ। তার জগৎ আবর্তিত হতো খেরোর খাতা, ব্যবসা, লেনা-দেনা এবং সংসারের নিত্যদিনের হিসাব-নিকাশকে কেন্দ্র করে। স্ত্রীর সূক্ষ্ম আবেগ, তার নিঃসঙ্গতা বা তার মনের খবর রাখার মতো মানসিকতা বা অবসর-কোনোটিই গৌরকিশোরের ছিল না। সে রসময়ীকে ভালোবাসত বটে, কিন্তু তা ছিল অত্যন্ত গতানুগতিক ও দায়িত্ব পালনের মতো। নিজের চারিপাশে সে গাম্ভীর্যের এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে রেখেছিল, যা ভেদ করার সাধ্য রসময়ীর ছিল না।

​     •দ্বিতীয় পর্যায়ঃ রসময়ী যখন তার জীবনে এক কাল্পনিক ‘সতীনের’ মনগড়া আখ্যান নিয়ে আসে, তখন গৌরকিশোরের চরিত্রে প্রথম ফাটল ধরে। প্রথমে সে বিষয়টিকে অবহেলায় উড়িয়ে দিলেও, রসময়ীর নিখুঁত অভিনয় এবং একের পর এক উপহার ও চিঠির মায়াজাল গৌরকিশোরের অবদমিত পুরুষ-অহংকারকে জাগ্রত করে তোলে। সে নিজের অজান্তেই এক অলীক নারীর প্রতি প্রচ্ছন্ন আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করে। ঘরের লক্ষ্মীকে উপেক্ষা করে সে বাইরের এক অদৃশ্য মরীচিকার মোহে চঞ্চল হয়ে ওঠে। রসময়ী যখনই বাপের বাড়ি যেত, গৌরকিশোর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত— কখন রসময়ী ফিরে এসে সেই অজ্ঞাত নারীর কথা শোনাবে। লেখকের কথায়-

​"গৌরকিশোরের মন এখন আর সেই পূর্বের ন্যায় ব্যবসায়ে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট থাকিত না; রসময়ীর মুখে সেই অজ্ঞাতকুলশীল নারীর কথা শুনিবামাত্র তাঁহার বুকের ভিতরটা কেমন এক অজ্ঞাত পুলকে চঞ্চল হইয়া উঠিত।"

​         এখানে গৌরকিশোরের অবৈষয়িক, রোমান্টিক মনের এক চোরা স্রোত লক্ষ্য করা যায়, যা রসময়ী এতদিন বহু চেষ্টা করেও জাগাতে পারেনি, কিন্তু এক কাল্পনিক নারী তা পেরেছিল।

​       •তৃতীয় পর্যায়ঃ আকস্মিক শোক, সত্যোদ্ঘাটন ও চরম অনুশোচনা দেখা যায় গৌরকিশোর চরিত্রের মধ্যে।আসলে গৌরকিশোর চরিত্রের চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটে গল্পের শেষাংশে, রসময়ীর আকস্মিক মৃত্যুর পর। রসময়ীর মৃত্যুর পর গৌরকিশোর যখন তার শেষ স্মৃতিচিহ্ন বা বাক্সটি খোলে, তখন তার মোহভঙ্গ ঘটে। সে জানতে পারে যে কোনো দ্বিতীয় নারী বা সতীন কখনোই ছিল না— পুরো বিষয়টিই ছিল রসময়ীর এক নিখুঁত কৌতুক অভিনয়। এই সত্য আবিষ্কার গৌরকিশোরকে এক ভয়াবহ অপরাধবোধ ও শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সে বুঝতে পারে, যে জীবন্ত নারীটি তার পাশে থেকে একটুখানি ভালোবাসার জন্য ছটফট করেছিল, তাকে সে চেনে নি; অথচ এক অলীক ছায়ার পেছনে সে মন বিলিয়ে দিয়েছিল। মৃত স্ত্রীর শেষ চিঠির প্রতিটি শব্দ তার বুকে তীরের মতো বিঁধেছিল:

​"গৌরকিশোর সেই পত্রখানি বুকে চাপিয়া ধরিয়া বালকের ন্যায় উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিলেন। এতদিনের সমস্ত গাম্ভীর্যের বাঁধ ভাঙিয়া তাঁহার চোখ দিয়া অশ্রুর বন্যা বহিল।"

​         এই অশ্রুই গৌরকিশোরের মানসিক রূপান্তরের প্রধান অস্ত্র। তার ভেতরের বৈষয়িক, গম্ভীর ও অহংকারী মানুষটি এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

       পরিশেষে বলা যায় যে,গৌরকিশোর চরিত্রটি আসলে একটি আত্মোপলব্ধির জার্নি বা রূপান্তরের ইতিবৃত্ত। গল্পের শুরুতে যে মানুষটি ছিল স্থূল ও আবেগহীন, গল্পের শেষে সে হয়ে উঠেছে এক অনুতপ্ত, মর্মাহত এবং একনিষ্ঠ শাশ্বত প্রেমিক। রসময়ীর 'রসিকতা' শেষ পর্যন্ত গৌরকিশোরের আত্মিক জাগরণের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় গৌরকিশোর চরিত্রের এই ট্র্যাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মানুষ অনেক সময় হাতের কাছের জিনিসের মূল্য বোঝে না, আর যখন বোঝে- তখন তা চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যায়। এই চিরন্তন মানবিক ব্যর্থতার রূপায়নেই গৌরকিশোর চরিত্রের সার্থকতা।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...