বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ কিভাবে হয়েছিল আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, দশম শ্রেণীর দ্বিতীয় সেমিস্টার ইতিহাস।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলায় মুদ্রণ যন্ত্র বা ছাপাখানার আগমনের ফলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে।যার ফলে হাতে লেখা পুঁথির বদলে ছাপা বইয়ের ব্যবহার জ্ঞানচর্চাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়।তবে-
বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের সূচনা হয় ইউরোপীয়দের হাত ধরে। ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকি কলকাতা থেকে ভারতের প্রথম সংবাদপত্র 'বেঙ্গল গেজেট'প্রকাশ করেন। যদিও এটি ইংরেজি ছিল, কিন্তু এটিই বাংলায় ছাপাখানার ভিত্তি স্থাপন করে। আর সেখানে-
বাংলা হরফ বা টাইপ তৈরির ক্ষেত্রে চার্লস উইলকিন্স-এর নাম অগ্রগণ্য। তাঁকে 'বাংলার গুটেনবার্গ বলা হয়। তাঁর নির্দেশনায় বাঙালি শিল্পী পঞ্চানন কর্মকার প্রথম সচল ও মার্জিত বাংলা হরফ তৈরি করেন। ১৭৭৮ সালে নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড-এর লেখা 'এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ'(A Grammar of the Bengal Language) বইটি প্রথম বাংলা হরফে ছাপা পূর্ণাঙ্গ বই।
বাংলায় মুদ্রণ ইতিহাসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো শ্রীরামপুর মিশন(১৮০০) প্রেসের প্রতিষ্ঠা। উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড (কেরি-মার্শম্যান-ওয়ার্ড ত্রয়ী) এটি স্থাপন করেন। আর সেখান থেকে বাইবেলের অনুবাদ, রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক এখান থেকে ছাপা হতে থাকে। এছাড়াও এখান থেকেই প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র 'দিগদর্শন' এবং সংবাদপত্র 'সমাচার দর্পণ' (১৮১৮) প্রকাশিত হয়।অতঃপর-
• ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও পাঠ্যপুস্তক।১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা মেটাতে ছাপাখানার দ্রুত বিকাশ ঘটে। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু প্রমুখের লেখা বইগুলি এই সময়েই মুদ্রিত হয়, যা বাংলা গদ্যের বিকাশেও সহায়তা করে।আর সেখানে উনিশ শতকের শুরুতে বাঙালিরাও ছাপাখানা ব্যবসায় এগিয়ে আসেন।বাবুরামের সংস্কৃত প্রেস,গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য,উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
পরিশেষ আমরা বলতে পারি যে,ছাপাখানার এই বিকাশ কেবল বই ছাপার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি বাংলায় নবজাগরণ, শিক্ষার প্রসার এবং জনমত গঠনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল।যার ফলে শ্রীরামপুর থেকে শুরু করে কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত এই মুদ্রণ বিপ্লবই আধুনিক বাঙালি সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
Comments
Post a Comment