Skip to main content

রসতত্ত্বঃ ভরত মুনির রসসূত্রটি উল্লেখ করে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দাও।

রসতত্ত্বঃ ভরত মুনির রসসূত্রটি উল্লেখ করে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।DS-5, Unit-III.(কাব্য জিজ্ঞাসা -অতুল চন্দ্র গুপ্ত )।

 রসসূত্রঃ আচার্য ভরত মুনি তাঁর ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে রস নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি বোঝাতে গিয়ে যে বিখ্যাত সূত্রটি দিয়েছেন, তা হলো-

​"বিভাবানুভাবব্যভিচারিসংযোগাদ্রসনিষ্পত্তিঃ"

       অর্থাৎ বাংলায় যার অর্থ-বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে রস নিষ্পন্ন বা জাগ্রত হয়।আসলে মানুষের অন্তরে কিছু চিরস্থায়ী আবেগ বা ভাব সুপ্ত অবস্থায় থাকে, যেগুলিকে স্থায়ী ভাব বলা হয় (যেমন—রতি, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ ইত্যাদি)। ভরত মুনির মতে, এই স্থায়ী ভাবটিই বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী ভাবের সংস্পর্শে এসে রসরূপে আস্বাদনযোগ্য হয়ে ওঠে।

উপাদানগুলির পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্ক

​      রস সূত্রের মূল রসায়নকে বুঝতে হলে প্রথমেই এর তিনটি মূল উপাদানকে আলাদা করে চিনে নেওয়া প্রয়োজন। নিচে একটি সহজ তালিকার মাধ্যমে এদের কাজ ও সম্পর্ক  হলো-

​১. বিভাব (কারন)। বিভাব হলো রসের কারণ। যা মানুষের ভেতরের সুপ্ত স্থায়ী ভাবকে জাগিয়ে তোলে বা উদ্দীপিত করে, তাকেই বিভাব বলে। এটি দুই প্রকার-

​       •আলম্বন বিভাবঃ যাকে আশ্রয় করে ভাবটি জাগে (যেমন—শকুন্তলাকে দেখে দুষ্যন্তের মনে প্রেম জাগলে, শকুন্তলা হলেন আলম্বন)।

​      •উদ্দীপন বিভাবঃযে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা পরিস্থিতি ভাবটিকে আরও বাড়িয়ে দেয় (যেমন—বসন্তকাল, নির্জন উপবন, কোকিলের ডাক ইত্যাদি)।

​২. অনুভাব (কার্য)।স্থায়ী ভাবটি জাগ্রত হওয়ার পর মানুষের শরীরে বা ব্যবহারে যে সমস্ত বাহ্যিক লক্ষণ বা শারীরিক পরিবর্তন প্রকাশ পায়, তাকে অনুভাব বলে। অর্থাৎ, এটি হলো ভাবের কার্য বা বহিঃপ্রকাশ (যেমন—লজ্জায় চোখ নিচু করা, রাগে কাঁপা, ভয়ে ঘাম হওয়া বা অশ্রুপাত)।

​৩. ব্যভিচারী ভাব বা সঞ্চারী ভাব (সহকারী)।

​        এই ভাবগুলি স্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। সাগরের বুকে যেমন ঢেউ ওঠে আর মিলিয়ে যায়, তেমনই মূল স্থায়ী ভাবটিকে পুষ্ট করতে কিছু ছোট ছোট আবেগ মনে আসে এবং চলে যায় (যেমন—শঙ্কা, স্মৃতি, গ্লানি, বিষাদ, হর্ষ ইত্যাদি)। এরা স্থায়ী ভাবকে রস পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক

​      ভরত মুনির সূত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো 'সংযোগ'। রস কোনো একক উপাদানের দ্বারা তৈরি হয় না; এটি এই উপাদানগুলির একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মতো। এদের পারস্পরিক সম্পর্কটি নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

​       •বীজ ও বৃক্ষের সম্পর্কঃস্থায়ী ভাব যদি হয় বীজ, তবে বিভাব হলো তার অঙ্কুরোদগমের জন্য মাটি ও জল (কারণ)। অনুভাব হলো সেই বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা ও পাতা (যা বাইরে থেকে দেখা যায়)। আর ব্যভিচারী ভাব হলো সেই বৃক্ষকে পুষ্ট করার অনুকূল আবহাওয়া।

​     •শৃঙ্খলিত ধারাবাহিকতাঃকাব্যে বা নাটকে প্রথমে বিভাব পরিস্থিতি তৈরি করে। সেই পরিস্থিতি মানুষের মনে স্থায়ী ভাবকে জাগিয়ে তোলে। ভাব জাগলে শরীরে অনুভাব বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। আর এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন ব্যভিচারী ভাবগুলি বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো এসে স্থায়ী ভাবটিকে আরও তীব্র ও ঘনীভূত করে তোলে।

​     •রসরূপ প্রাপ্তি: যখন এই উপাদানগুলি সম্পূর্ণ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখনই পাঠক বা দর্শকের হৃদয়ে রসের আস্বাদন ঘটে।

​      লৌকিক উদাহরণঃধরা যাক একটি করুণ দৃশ্য। কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু এখানে বিভাব (কারণ)। এর ফলে চোখে জল আসা, বুক চাপড়ানো বা মূর্ছা যাওয়া হলো অনুভাব (বাহ্যিক প্রকাশ)। আর মনের মধ্যে পুরোনো স্মৃতি ভেসে ওঠা বা তীব্র বিষাদ হলো ব্যভিচারী ভাব। এই সবকিছুর রসায়নে পাঠক বা দর্শকের মনে শেষ পর্যন্ত 'করুণ রস' জাগ্রত হয়।

​          পরিশেষে আমাদের বলতেই হয় যে, বিভাব হলো কারণ, অনুভাব হলো তার ফল বা কার্য, এবং ব্যভিচারী ভাব হলো তার সহকারী কারণ। এই তিনের নিপুণ সংযোগেই মানুষের হৃদয়ের সুপ্ত স্থায়ী ভাবটি শেষ পর্যন্ত অলৌকিক ‘রস’-এ রূপান্তরিত হয়। 

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...