মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস কাকে বলে ? এই উপন্যাসের প্রধান লক্ষণগুলো লেখো। রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' বা 'চতুরঙ্গ' অবলম্বনে এই শ্রেণীর উপন্যাসের সার্থকতা বিচার করো।
মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস কাকে বলে ? এই উপন্যাসের প্রধান লক্ষণগুলো লেখো। রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' বা 'চতুরঙ্গ' অবলম্বনে এই শ্রেণীর উপন্যাসের সার্থকতা বিচার করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর DS-5, Unit-2
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের বিবর্তনের ধারায় মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আধুনিক শাখা। যেখানে সাধারণ উপন্যাসে বাইরের ঘটনা বা প্লট প্রধান হয়ে ওঠে, সেখানে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে মানুষের মনের গহীন কোণ, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, দ্বন্দ্ব এবং অবচেতন মনের বিশ্লেষণই মুখ্য। আর এই নিরিখে আমরা বলতে পারি-
যে উপন্যাসে বাহ্যিক ঘটনার ঘনঘটার চেয়ে চরিত্রের অন্তর্জগৎ বা মনের গূঢ় রহস্য বিশ্লেষণে লেখক বেশি মনোযোগী হন, তাকেই মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলা হয়। এখানে 'কী ঘটছে' তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় চরিত্রটি 'কী ভাবছে' বা 'কেন এমন আচরণ করছে'। মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, অবদমিত কামনা, ঈর্ষা, প্রেম এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের ব্যবচ্ছেদই এই জাতীয় উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য।
•মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রধান লক্ষণ সমূহ•
১. অন্তর্মুখিতা: কাহিনীর বিস্তার বাইরের জগতের চেয়ে চরিত্রের মনের ভেতরেই বেশি ঘটে।
২. চরিত্রের প্রাধান্য: এখানে প্লট বা কাহিনী চরিত্রের অনুগামী হয়, চরিত্র কাহিনীর অনুগামী নয়।
৩. মানসিক দ্বন্দ্ব (Internal Conflict): নৈতিকতা বনাম আকাঙ্ক্ষা, কিংবা কর্তব্য বনাম প্রেমের মধ্যে চরিত্রের যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
৪. অবচেতন মনের বিশ্লেষণ: চরিত্রের সাধারণ আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা অবচেতন বা গূঢ় কারণগুলো লেখক খুঁজে বের করেন।
৫. ঘটনার মন্থরতা: বাইরের ঘটনার চেয়ে মানসিক প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা বেশি থাকে বলে কাহিনীর গতি সাধারণত মন্থর হয়।
৬. কার্যকারণ সম্পর্ক: একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার পেছনে অতীতের কোনো স্মৃতি বা আঘাত কীভাবে কাজ করছে, তার যৌক্তিক বিশ্লেষণ থাকে।
৭. চেতনাপ্রবাহ (Stream of Consciousness): অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রের অসংলগ্ন চিন্তার ধারাকে সরাসরি উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
৮. জটিল মানবিক সম্পর্ক: প্রেম বা বন্ধুত্বের সাধারণ সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ও জটিল দিকগুলো দেখানো হয়।
৯. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য: সমষ্টিগত মানুষের চেয়ে বিশেষ কোনো একক মানুষের স্বতন্ত্র সত্তা এখানে বেশি গুরুত্ব পায়।
১০. প্রতীকী ব্যঞ্জনা: অনেক সময় লেখকের বর্ণনা বা পরিবেশের চিত্রায়ন চরিত্রের মানসিক অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস: 'চোখের বালি'
বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে ১৯০৩ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের **'চোখের বালি'** একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগে উপন্যাসে ঘটনার ঘনঘটা বা রোমান্টিক অ্যাডভেঞ্চারের যে প্রাধান্য ছিল, রবীন্দ্রনাথ সেখান থেকে সরে এসে মানুষের অন্তর্জগৎ বা মনের রহস্য উন্মোচনে ব্রতী হলেন। এই উপন্যাসের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যে **মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের** শুভ সূচনা ঘটে।
মনস্তাত্ত্বিক সার্থকতার প্রধান দিকসমূহ
১. ঘটনার চেয়ে চরিত্রের মনোজগতকে প্রাধান্যঃ 'চোখের বালি'- উপন্যাসে বাইরের বড় কোনো যুদ্ধ বা অতিপ্রাকৃত ঘটনা নেই। এখানে কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু হলো কয়েকটি মানুষের মনের ঘাত-প্রতিঘাত। মহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশালতা এবং বিহারী-এই চারটি চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি। আর সেই চালিকাশক্তিতে আমরা দেখতে পাই -
২. বিনোদিনী: অবদমিত কামনার ও বঞ্চনার রূপ আসলে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিনোদিনী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র। রূপ-গুণ-শিক্ষায় অনন্যা হওয়া সত্ত্বেও সমাজ তাকে বিধবা হিসেবে একঘরে করে রেখেছে। তার এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নেয় ঈর্ষা এবং নিজের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে মহেন্দ্রকে প্রলুব্ধ করে কেবল প্রেমের জন্য নয়, বরং তার হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের এক মানসিক জেদ থেকে।তবে-
৩. মহেন্দ্রের চারিত্রিক অস্থিরতা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়। আর সেখানে মহেন্দ্র চরিত্রটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্বের ফসল। সে একদিকে মাতৃভক্ত, অন্যদিকে নব্যবিবাহিতা স্ত্রীর প্রতি আসক্ত, আবার বিনোদিনীর বুদ্ধির দীপ্তিতে সে মোহাচ্ছন্ন। তার এই চিত্তচাঞ্চল্য এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।এছাড়াও আমরা দেখতে পাই-
৪. দাম্পত্য জীবনের জটিলতা। মহেন্দ্র ও আশালতার সুখী দাম্পত্যের মাঝে বিনোদিনীর প্রবেশ কোনো বাইরের দুর্যোগ নয়, বরং তা ছিল মহেন্দ্রের মানসিক অতৃপ্তির বহিঃপ্রকাশ। প্রেমের ভেতরে যে গোপন ঈর্ষা এবং অধিকারবোধ থাকে, তা এই উপন্যাসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আর সেই কারণেই এই উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই-
৫. অবচেতন মনের ক্রিয়া। যেখানে আশালতা সহজ-সরল মেয়ে হলেও বিনোদিনীর প্রভাবে তার ভেতরেও যে নারীত্বের জাগরণ ঘটে, তা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক চমৎকার দিক। বিহারীর প্রতি বিনোদিনীর যে গোপন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হয়, তা তার অবচেতন মনের এক বিশাল পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। সেহেতু-
৬. নৈতিক দ্বন্দ্ব ও সমাজচিন্তা এ উপন্যাসে একটি বিস্তর জায়গা দখল করে নিয়েছে।তাই তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় বিধবাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোনো মূল্য দেওয়া হতো না। রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, নৈতিকতার কঠিন আবরণে মোড়া সমাজের নিচেও মানুষের জৈবিক ও মানসিক চাহিদাগুলো ধিকিধিকি জ্বলে। এই নৈতিক দ্বন্দ্বই উপন্যাসটিকে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দান করেছে। তবুও এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি-
'চতুরঙ্গ' বনাম 'চোখের বালি' উপন্যাসের স্মরণির স্মৃতিরেখা পটে 'চোখের বালি' প্রথম সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।তবে রবীন্দ্রনাথের 'চতুরঙ্গ' (১৯১৬) এই ধারার আরও পরিণত রূপ। সেখানে শচীশ ও দামিনীর মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতা বনাম জৈবিক প্রবৃত্তির যে লড়াই দেখানো হয়েছে, তা মনস্তত্ত্বের শিখরে অবস্থান করে। তবে সহজবোধ্যতা ও গভীরতার বিচারে 'চোখের বালি'- শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'চোখের বালি' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের মন এক গভীর অরণ্যের মতো। সেখানে আলো-ছায়ার খেলা যেমন আছে, তেমনি আছে ভয়ঙ্কর চোরাবালি। চরিত্রগুলোর প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে যে মানসিক কার্যকারণ তিনি দেখিয়েছেন, তা-ই এই উপন্যাসকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের মর্যাদা দিয়েছে।
Comments
Post a Comment