রসতত্ত্বঃ ভরত মুনির রসসূত্রটি উল্লেখ করে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দাও।
রসতত্ত্বঃ ভরত মুনির রসসূত্রটি উল্লেখ করে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।DS-5, Unit-III.
রসতত্ত্ব: ভরত মুনির রসসূত্র ও উপাদানসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচনায় আমরা প্রথমেই বলে রাখি যে,ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্ব এবং নন্দনতত্ত্বের ইতিহাসে আচার্য ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’(খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়) একটি আকর গ্রন্থ। এই গ্রন্থের ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে রস ও ভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ভরত মুনি রস নিষ্পত্তির যে অমোঘ সূত্রটি নির্মাণ করেছেন, তা কাব্য ও নাট্য উভয় সাহিত্যেরই প্রাণস্বরূপ।আর সেখানে-আচার্য ভরতের অমর রসসূত্রটি হলো-
"বিভাবানুভাবব্যভিচারি সংযোগাদ্রসনিষ্পত্তিঃ"
অর্থাৎ,সামাজিক বা সহৃদয় পাঠকের অন্তরে কিছু ভাব জন্মসূত্রেই সুপ্ত বা বাসনারূপে অবস্থান করে। এদের স্থায়ী ভাব বলা হয়। যখন নাট্যমঞ্চে বা কাব্যের জগতে এই স্থায়ী ভাবের সঙ্গে বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাবের ‘সংযোগ’ ঘটে, তখনই সহৃদয় হৃদয়সংবাদী পাঠকের মনে ‘রস’-এর ‘নিষ্পত্তি’ বা আস্বাদন ঘটে।তবে-
রসকে সহজভাবে বুঝতে ভরতের একটি বিখ্যাত লৌকিক উদাহরণ স্মরণ করা যায়। যেমন-গুড়, চাল, দুধ, নানাবিধ মশলা ইত্যাদির সুষম মিশ্রণে যেমন একটি অপূর্ব স্বাদযুক্ত ‘পায়েস’ বা রসাল ব্যঞ্জন তৈরি হয়, ঠিক তেমনই মানুষের মনের স্থায়ী ভাবটি বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সার্থক রসায়নে আস্বাদনযোগ্য ‘রস’-এ পরিণত হয়।
•রসসূত্রের উপাদানসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিচয়•
রসসূত্রটিকে বিস্তারিতভাবে বুঝতে গেলে এর প্রতিটি উপাদানের গভীর স্বরূপ জানা আবশ্যক।আর সেখানে আমরা দেখি-
ক) স্থায়ী ভাব (রসের আধার)-স্থায়ী ভাব হলো এমন বিষয়, যা মানুষের চিত্তে সর্বদা সংস্কার বা বাসনারূপে অবস্থান করে এবং অনুকূল বা প্রতিকূল কোনো ভাবই যাকে বিনষ্ট করতে পারে না, তাকে স্থায়ী ভাব বলে। ভরত মুনির মতে স্থায়ী ভাব ৮টি (পরবর্তীকালে মন্মট ও বিশ্বনাথ কবিরাজ শান্ত ভাবকে যুক্ত করে ৯টি বা নবরস স্বীকার করেছেন)।আর সেই ভাবগুলি হলো-
• রতি (প্রেম), •হাস, •শোক, •ক্রোধ, •উৎসাহ, •ভয়, •জুগুপ্সা (ঘৃণা), •বিস্ময় এবং শম (শম বা নির্বেদ থেকে শান্ত রস)।
খ) বিভাব (রসের কারণ)-লোকসংসারে যা আবেগ বা ভাবের ‘কারণ’, কাব্যে বা নাটকে তাকেই বলা হয় ‘বিভাব’। অর্থাৎ, যার দ্বারা স্থায়ী ভাবটি জাগ্রত বা উদ্দীপিত হয়। বিভাব দুই প্রকার-
1.আলম্বন বিভাবঃ ভাবটি যাকে অবলম্বন করে বা যাকে আশ্রয় করে জেগে ওঠে। আলম্বন আবার দুভাগে বিভক্ত—
•আশ্রয় আলম্বনঃ যার মনে ভাবটি জাগছে (যেমন: দুষ্যন্তের মনে প্রেম জাগলে দুষ্যন্ত হলেন আশ্রয়)।
•বিষয় আলম্বনঃ যাকে দেখে ভাবটি জাগছে (যেমন: শকুন্তলাকে দেখে প্রেম জাগলে শকুন্তলা হলেন বিষয়)।
2.উদ্দীপন বিভাবঃ যে বাহ্যিক পরিবেশ, পরিস্থিতি বা উদ্দীপক উপাদান সুপ্ত ভাবটিকে আরও বেশি তীব্র করে তোলে। যেমন— জ্যোৎস্না রাত, কোকিলের ডাক, মলয় বাতাস, নির্জন নদীতীর ইত্যাদি।
গ) অনুভাব (রসের কার্য বা বহিঃপ্রকাশ)-স্থায়ী ভাবটি মনের ভেতরে জাগ্রত হওয়ার পর তা তো আর চাপা থাকে না, বাইরে প্রকাশ পায়। মনের ভাবের সেই বাহ্যিক, শারীরিক বা বাচনিক প্রকাশকেই বলা হয় ‘অনুভাব’। লৌকিক অর্থে যা ‘কার্য’ বা ফল।
•উদাহরণঃ ক্রোধ জাগলে চোখ লাল হওয়া বা দাঁত কিড়মিড় করা; ভয় পেলে কাঁপা বা ঘাম হওয়া; প্রেম জাগলে কটাক্ষপাত বা মৃদু হাসা।
সাত্ত্বিক ভাবঃ অনুভাবেরই একটি বিশেষ রূপ হলো সাত্ত্বিক ভাব (সংখ্যায় ৮টি, যেমন—অশ্রু, কম্প, স্তম্ভ, স্বেদ ইত্যাদি), যা মনের তীব্র আবেগে শরীরের ওপর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেসে ওঠে, কৃত্রিমভাবে একে তৈরি করা যায় না।
ঘ) ব্যভিচারী বা সঞ্চারী ভাব (সহকারী কারণ)-যে ভাবগুলি স্থায়ী ভাবের মতো মনের মধ্যে চিরকাল জাঁকিয়ে বসে থাকে না, বরং প্রধান স্থায়ী ভাবটিকে পুষ্ট করার জন্য ক্ষণিকের তরে চিত্তাকাশে উদিত হয় এবং কাজ শেষে মূল ভাবে লীন হয়ে যায়, তাদের ব্যভিচারী ভাব বলে। ভরত মুনি **৩৩টি** ব্যভিচারী ভাবের উল্লেখ করেছেন (যেমন—শঙ্কা, বিষাদ, দৈন্য, গ্লানি, মদ, মোহ, গর্ব, স্মৃতি ইত্যাদি)।
•উপমাঃসমুদ্রের বুকে যেমন অসংখ্য ছোট ছোট ঢেউ ওঠে, সমুদ্রের জলকে আন্দোলিত করে আবার সমুদ্রেরই বুকে মিলিয়ে যায়—ব্যভিচারী ভাবগুলিও ঠিক তেমনি স্থায়ী ভাবের সহায়ক তরঙ্গ।
৩. উপাদানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক ও রসের ‘সংযোগ’ ও ‘নিষ্পত্তি’
ভরত মুনির রসসূত্রের সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে দুটি শব্দের মধ্যে— **'সংযোগ'** এবং **'রসনিষ্পত্তি'**। এই উপাদানগুলি বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়, এরা একে অপরের পরিপূরক। এদের পারস্পরিক সম্পর্কটি নিম্নরূপ:
```
[ সুপ্ত স্থায়ী ভাব ]
+
[ বিভাব (কারণ) ] ──> ভাবকে জাগিয়ে তোলে
+
[ অনুভাব (কার্য) ] ──> ভাবকে বাইরে প্রকাশ করে
+
[ ব্যভিচারী ভাব (সহকারী) ] ──> ভাবকে তীব্র ও পুষ্ট করে
│
▼
[ অলৌকিক রস আস্বাদন ] (রসনিষ্পত্তি)
```
### ১. কার্য-কারণ-সহকারী সম্বন্ধ (Causal Relationship):
রস সৃষ্টিতে উপাদানগুলির সম্পর্ক অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক। **বিভাব হলো কারণ, অনুভাব হলো কার্য এবং ব্যভিচারী ভাব হলো সহকারী কারণ।** কাব্যে বা নাটকে প্রথমে বিভাব পরিস্থিতি তৈরি না করলে ভাব জাগতেই পারে না। ভাব না জাগলে অনুভাবের মাধ্যমে তার শারীরিক প্রকাশ অসম্ভব। আর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে রসঘন করতে ব্যভিচারী ভাবের জোগান আবশ্যিক।
### ২. একমুখী লক্ষ্য (Unity of Purpose):
এই তিন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্কের মূল লক্ষ্য একটাই—সুপ্ত স্থায়ী ভাবটিকে টেনে বের করে তাকে রসে রূপান্তরিত করা। যতক্ষণ না বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাব একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে (স্থায়ী ভাবে) এসে মিলছে, ততক্ষণ রসের সৃষ্টি হয় না।
### ৩. অলৌকিক রসায়ন (Organic Whole):
পরবর্তীকালের মহান টীকাকার **অভিনবগুপ্ত** (অভিব্যক্তিবাদ) ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, বিভাব-অনুভাব-ব্যভিচারীর এই সংযোগ কোনো সাধারণ মিশ্রণ নয়। রসের আস্বাদন যখন ঘটে, তখন পাঠক আর আলাদা করে বিভাব বা অনুভাবকে গোনে না। যেমন শরবত পানের সময় লেবু, চিনি বা জলের স্বাদ আলাদা করে পাওয়া যায় না, সব মিলে একটি নতুন অখণ্ড স্বাদ তৈরি হয়—রসও তেমনই একটি অখণ্ড আস্বাদ।
## একটি সম্পূর্ণ উদাহরণ সহ বিশ্লেষণ
রসসূত্রের এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটি কবি কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটকের একটি দৃশ্য দিয়ে সহজে বুঝে নেওয়া যাক:
* **পরিস্থিতি:** রাজা দুষ্যন্ত তপোবনে প্রবেশ করে শকুন্তলাকে দেখলেন। শকুন্তলা তখন সখীদের সাথে গাছে জল দিচ্ছেন।
* **স্থায়ী ভাব:** দুষ্যন্তের মনের ভেতরে জন্মাবধি সুপ্ত থাকা প্রবৃত্তি বা **'রতি'** (প্রেম) ভাব।
* **বিভাব (আলম্বন ও উদ্দীপন):** এখানে **বিষয় আলম্বন** হলেন অপরূপা শকুন্তলা এবং **আশ্রয় আলম্বন** হলেন রাজা দুষ্যন্ত। আর তপোবনের শান্ত পরিবেশ, স্নিগ্ধ গাছের ছায়া, ভ্রমরের গুঞ্জন হলো **উদ্দীপন বিভাব**। এদের কারণে দুষ্যন্তের মনের সুপ্ত রতি ভাবটি জেগে উঠল।
* **অনুভাব:** শকুন্তলাকে দেখে রাজার রোমাঞ্চ হলো, তিনি অনুচ্চস্বরে সখীদের কথা শুনতে লাগলেন, তাঁর দৃষ্টি চঞ্চল হলো। এগুলি হলো **অনুভাব** (বাহ্যিক লক্ষণ)।
* **ব্যভিচারী ভাব:** রাজার মনে ক্ষণে ক্ষণে জাগছে ‘হর্ষ’ (আনন্দ), ক্ষণে ‘শঙ্কা’ (ঋষিকন্যাকে প্রেম নিবেদন করা যাবে কি না) এবং শকুন্তলার রূপের মোহে ‘তুষ্টি’। এগুলি **ব্যভিচারী ভাব**।
* **রসের রূপান্তর:** এই বিভাব, অনুভাব এবং ব্যভিচারী ভাবের সার্থক মিলনে দুষ্যন্তের (এবং সমান্তরালভাবে নাটকের দর্শকের) মনের সেই ব্যক্তিগত 'রতি' ভাবটি সমস্ত লৌকিক সীমানা ছাড়িয়ে অলৌকিক **'শৃঙ্গার রস'**-এ রূপান্তরিত হলো।
## উপসংহার
সুতরাং বলা যায়, আচার্য ভরত মুনির রসসূত্রে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাব হলো রস-প্রাসাদের তিনটি মূল স্তম্ভ। এদের পারস্পরিক সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। বিভাব ভাবকে আহ্বান করে, অনুভাব তাকে রূপ দেয় এবং ব্যভিচারী ভাব তাকে পূর্ণতা দেয়। এই তিনের সার্থক সংযোগেই কাব্যের চিরন্তন রসাস্বাদন সম্ভব হয়, যা পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে রসতত্ত্বের মূল ভিত্তি।
Comments
Post a Comment