অনুপ্রাস অলংকার কাকে বলে ? অনুপ্রাস অলংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ষষ্ঠ সেমিস্টার, বাংলা মেজর DS12,Unit-1
অনুপ্রাস অলঙ্কারঃএকই ব্যঞ্জনধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনিগুচ্ছ যুক্ত বা বিযুক্ত অবস্থায় একাধিকবার উচ্চারিত হয়ে যে ধ্বনিমাধুর্য বা শ্রুতিসুখকর ধ্বনিঝঙ্কার সৃষ্টি করে, তাকে অনুপ্রাস অলঙ্কার বলে।আর এই অনুপ্রাসের মূল শর্ত হলো বর্ণের পুনরাবৃত্তি। এখানে স্বরবর্ণের সাম্য থাকা জরুরি নয়, কেবল ব্যঞ্জনবর্ণের মিল থাকলেই অনুপ্রাস হয়।উদাহরণ-
"কুলায় কাঁপন লাগে লতার লহরী।"
ব্যাখ্যাঃ উপরের উদাহরণটিতে অনুপ্রাস অলঙ্কারের সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে।এখানে আমরা দেখতে পাই যে-একই ব্যঞ্জনধ্বনির পুনরাবৃত্তি হয়েছে বারবার।এই বাক্যটিতে 'ল' ব্যঞ্জনধ্বনিটি মোট চারবার ব্যবহৃত হয়েছে ( কুলায়,লাগে, লতার, লহরী- ল)। 'ল' ধ্বনিটি বারবার ফিরে আসার ফলে চরণে একটি চমৎকার সংগীতময় দোলা বা ঝঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।যেহেতু এখানে একটি ব্যঞ্জনধ্বনি ('ল') দুইয়ের বেশিবার (বহুবার) আবৃত্ত হয়েছে, তাই এটি অনুপ্রাসের একটি বিশেষ ভাগ 'বৃত্যানুপ্রাস'-এর অন্তর্ভুক্ত।
•অনুপ্রাস অলঙ্কারের শ্রেণীবিভাগ•
•অনুপ্রাস অলঙ্কারকে সাধারণত পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যথা:
১. ছেকানুপ্রাস অলঙ্কার। •২. বৃত্যানুপ্রাস অলঙ্কার •৩. শ্রুত্যনুপ্রাস অলঙ্কার•৪. অন্ত্যানুপ্রাস অলঙ্কার ৫. লাটানুপ্রাস অলঙ্কার।
১) ছেকানুপ্রাস অলঙ্কারঃ দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি গুচ্ছভাবে যুক্ত বা বিযুক্ত অবস্থায় যদি ক্রমানুসারে মাত্র দুইবার ধ্বনিত হয়, তাকে ছেকানুপ্রাস বলে। 'ছেক' শব্দের অর্থ হলো বিদগ্ধ বা চতুর ব্যক্তি।উদাহরণ-
"কুসুমিত কানন কুঞ্জ মঞ্জুল রে।"
ব্যাখ্যাঃ এখানে 'ন' এবং 'জ' মিলে 'ঞ্জ' গুচ্ছধ্বনিটি পরপর দুইবার (কুঞ্জ ও মঞ্জুল) আসায় এখানে ছেকানুপ্রাস হয়েছে।
২)) বৃত্যানুপ্রাস অলঙ্কারঃ একটি ব্যঞ্জনধ্বনি বহুবার বা ব্যঞ্জনধ্বনিগুচ্ছ বহুবার আবৃত্ত হলে তাকে বৃত্যানুপ্রাস বলে। এটি বাংলা কবিতায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।উদাহরণ- "চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।"
ব্যাখ্যাঃ এখানে 'র' এবং 'ন' ধ্বনিটি বারবার আবৃত্ত হয়ে একটি সংগীতময় আবহ সৃষ্টি করেছে, তাই এটি বৃত্যানুপ্রাস।
#### **গ) শ্রুত্যনুপ্রাস**
উচ্চারণস্থান অনুযায়ী একই স্থান থেকে উচ্চারিত (যেমন— দন্ত্য, কণ্ঠ্য, তালব্য ইত্যাদি) ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের মিল ঘটলে তাকে শ্রুত্যনুপ্রাস বলে। এটি শুনতে মধুর হয় বলে একে শ্রুত্যনুপ্রাস বলা হয়।
* **উদাহরণ:** *"তিল তিল করি তনু তনু দান।"*
* **বিশ্লেষণ:** এখানে 'ত', 'ল', 'ন'— এই বর্ণগুলি দন্ত্যধ্বনি। একই উচ্চারণস্থলের বর্ণের বারংবার ব্যবহারের ফলে এখানে শ্রুত্যনুপ্রাস হয়েছে।
#### **ঘ) অন্ত্যানুপ্রাস**
কবিতার এক চরণের শেষে যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি থাকে, পরবর্তী চরণের শেষেও যদি সেই একই ধ্বনির মিল থাকে, তাকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে। একে সাধারণত আমরা 'মিত্রাক্ষর ছন্দ' বা 'মিল' বলে থাকি।
* **উদাহরণ:** > *"পাখি সব করে **রব** রাতি পোহাইল,*
> *কাননে কুসুম কলি সকলি ফু**টিল**।"*
>
* **বিশ্লেষণ:** এখানে প্রথম চরণের শেষে 'রব' এবং দ্বিতীয় চরণের শেষে 'টিল' ধ্বনিসাম্য না থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চরণের অন্তিম ধ্বনির যে সাম্য থাকে তাকেই অন্ত্যানুপ্রাস ধরা হয়। (সার্থক উদাহরণ: 'আলাইয়া' - 'ফালাইয়া')।
#### **ঙ) লাটানুপ্রাস**
একই শব্দ বা শব্দসমষ্টি যখন একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু তাদের তাৎপর্য বা অন্বয় ভিন্ন হয়, তখন তাকে লাটানুপ্রাস বলে।
* **উদাহরণ:** *"যে জন সেবে সেবিতে জানে, তার চরণে মন মজুক।"*
* **বিশ্লেষণ:** এখানে 'সেবে' এবং 'সেবিতে' শব্দদুটি একই মূল ধাতু থেকে জাত এবং একই অর্থ বহন করলেও অন্বয়গতভাবে বাক্যের গভীরতা প্রকাশ করছে।
### **৪. উপসংহার**
অনুপ্রাস অলঙ্কার বাংলা কাব্যের শব্দঝঙ্কার ও ধ্বনিমাধুর্য বৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বৈষ্ণব পদাবলী এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতায় অনুপ্রাসের সার্থক প্রয়োগ কাব্যের গীতিধর্মিতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
> **পরীক্ষার টিপস:** বড় উত্তরের ক্ষেত্রে প্রতিটি পয়েন্টের পাশে অবশ্যই একটি করে উদাহরণ দেবেন এবং এক লাইনে তার ব্যাখ্যা (বিশ্লেষণ) করবেন। এতে পূর্ণ নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
>
Comments
Post a Comment