Skip to main content

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।


পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার জন্য এবং উত্তরটিকে আরও আকর্ষণীয় ও সমৃদ্ধ করতে **সুবোধ ঘোষের 'অযান্ত্রিক' ছোটগল্পের নামকরণের সার্থকতা** সংক্রান্ত নোটটি গল্প থেকে উপযুক্ত উদ্ধৃতি ও গভীরতর বিশ্লেষণসহ নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। ১০ বা ১৫ নম্বরের বড় প্রশ্নের জন্য এটি একটি আদর্শ নোট।

# সুবোধ ঘোষের 'অযান্ত্রিক' ছোটগল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার (উদ্ধৃতিসহ বিস্তারিত রূপ)

### ভূমিকা:

সাহিত্যে নামকরণ কেবল কোনো রচনার পরিচয়বাহী নামমাত্র নয়, তা হলো সমগ্র সৃষ্টির অন্তঃসার। নাম দেখেই পাঠক গল্পের অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান পায়। কল্লোল-পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম মৌলিক কথাকার সুবোধ ঘোষ তাঁর ‘অযান্ত্রিক’ গল্পে এমন এক নামকরণের আশ্রয় নিয়েছেন, যা প্রথম পাঠে আপাত-বিরোধী বা কৌতূহলকর মনে হলেও গল্পের মূল ভাববস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে। যন্ত্র ও মানুষের সম্পর্কের জটিল রসায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই গল্পের নামকরণের সার্থকতা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

### নামকরণের শাব্দিক অর্থ ও আপাত বৈপরীত্য:

অভিধান অনুযায়ী ‘অযান্ত্রিক’ শব্দের অর্থ হলো—যা যান্ত্রিক নয়, বা যাতে যন্ত্রের কোনো ভূমিকা নেই; যা মায়াময়, অনুভূমিক এবং মানবিক। অথচ গল্পের বাহ্যিক অবয়বটি সম্পূর্ণ 'যান্ত্রিক'। গল্পের মূল উপজীব্য হলো একটি পুরোনো, জীর্ণ, পনেরো বছরের ভাঙাচোরা ‘শেভ্রোলেট’ ব্র্যান্ডের ট্যাক্সি, যার নাম ‘জগদ্দল’ এবং তার চালক বিমল। বিমলের দিনলিপি, জীবিকা ও প্রাত্যহিক চিন্তা আবর্তিত হয়েছে এই মোটর গাড়িটিকে কেন্দ্র করেই। ফলে আপাতদৃষ্টিতে গল্পটিকে অত্যন্ত ‘যান্ত্রিক’ মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু লেখক সুবোধ ঘোষ এখানেই তাঁর কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন; তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিমলের নিবিড় ছোঁয়ায় এবং হৃদয়ের প্রক্ষেপে এই জড় যন্ত্রটিই শেষ পর্যন্ত এক ‘অযান্ত্রিক’ আত্মিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে।

### যন্ত্রের সজীবতা ও মানবিক রূপান্তর (উদ্ধৃতিসহ বিশ্লেষণ):

বিমলের কাছে জগদ্দল কেবল লোহা-লক্কড়, টিন আর মবিলের এক জড় সমষ্টি নয়। একাকী ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন বিমল তার নিঃসঙ্গ জীবনের সমস্ত অবদমিত স্নেহ, ভালোবাসা আর মায়া এই গাড়িটির ওপর প্রক্ষেপ করেছে। বিমলের বিশ্বাস, জগদ্দলের একটি নিজস্ব মন ও চরিত্র আছে। তাই সে তার গাড়ির সঙ্গে মানুষের মতোই আচরণ করে:

 * **অন্যায় ও অপমানের প্রতিবাদ:** বিমলের দৃঢ় ধারণা, জগদ্দল কোনো অন্যায় বা অসম্মান সহ্য করতে পারে না। লাইনে বেশি যাত্রী তুললে বা অন্য কোনো চালক তার স্টিয়ারিং ধরলে গাড়িটি বিগড়ে যায়। লেখকের ভাষায়:

   > *"জগদ্দল কোন অন্যায় সহ্য করে না। তিনজনের বেশি সওয়ারী চাপাও, জগদ্দল কিছুতেই নড়বে না।"*

   > 

 * **যন্ত্রের শরীরে জেদ:** চাতরা চটির খাড়াই পাহাড়ি রাস্তা পার হওয়ার সময় যখন গাড়ির ইঞ্জিন গরম হয়ে ওঠে এবং তা বিকট শব্দ করতে থাকে, তখন বিমলের মনে হয় তা কোনো মেকানিক্যাল ত্রুটি নয়, বরং তা জগদ্দলের পুরুষকার ও লড়াই। লেখকের ভাষায়:

   > *"যন্ত্রের শরীরে যেন একটা অদম্য জেদ জেগে উঠেছে। ধোঁয়া ছেড়ে, জল ফুটিয়ে, সমস্ত কলকব্জা কাঁপিয়ে গোঁ গোঁ শব্দে জগদ্দল চড়াইয়ের বুক চিরে ওপরে উঠতে থাকে।"*

   > 

 * **প্রেমিকা ও সন্তানের রূপ:** বিমল যখন পরম যত্নে গাড়ির গায়ে হাত বোলায়, তখন তার মনে হয় সে কোনো অবাধ্য অশ্ব বা অভিমানী প্রেমিকাকে শান্ত করছে। আবার কখনো সে তার সন্তানের মতো যত্ন পায়। বিমলের চোখে সে কোনো জড় পদার্থ নয়:

   > *"জগদ্দল বিমলের শুধু অন্নদাতা নয়, তার চেয়েও কিছু বেশি। বিমলের একাকী জীবনের একমাত্র সাথি, একমাত্র সজীব সত্তা।"*

   > 

এইভাবে, বিজ্ঞানের চরম সৃষ্টি একটি 'যান্ত্রিক' বস্তুকে বিমল তার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ, স্নেহ আর ভালোবাসা দিয়ে ‘অযান্ত্রিক’ করে তুলেছে।

### মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট:

মনস্তত্ত্বের ভাষায় বিমলের এই আচরণকে বলা হয় ‘প্রক্ষেপণ’ বা *Psychological Projection*। রাঁচি ও চাতরা চটির আদিবাসী সাঁওতাল সমাজের সহজ-সরল প্রকৃতির পটভূমিতে বিমল এক নির্বাসিত, একাকী চরিত্র। মানবসমাজে তার নিজের আবেগ বা ভালোবাসা প্রকাশের কোনো স্থান ছিল না বলেই সে এক জড় বস্তুর মধ্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে যন্ত্রের সঙ্গে তার সম্পর্কটি কোনো মেকানিকের সম্পর্ক নয়, তা সম্পূর্ণ হৃদয়ঘটিত এবং ‘অযান্ত্রিক’।

### গল্পের ট্রাজিক পরিণতি ও মোহাচ্ছন্নতার অবসান:

গল্পের নামকরণের চূড়ান্ত সার্থকতা প্রমাণিত হয় এর সমাপ্তিতে। দীর্ঘদিনের জীর্ণতার পর একদিন জগদ্দলের ইঞ্জিন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। বিমলের সমস্ত অনুনয়-বিনয়, জল-তেল ঢালা ও সেবা ব্যর্থ করে দিয়ে সে অচল হয়ে পড়ে। অনন্যোপায় হয়ে বিমল যখন তার সর্বক্ষণের সঙ্গীকে এক মাড়োয়ারি ভাঙারিওয়ালার কাছে সস্তায় লোহা-লক্কড়ের দরে বিক্রি করে দেয়, তখন বিমলের মনের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সে অনুভব করে, সে যেন কোনো জড় বস্তু বিক্রি করেনি, বরং তার নিজের জীবনের একটা অংশকে বা তার কোনো পরম আত্মীয়কে বিসর্জন দিয়েছে। যখন জগদ্দলকে কসাইয়ের মতো টুকরো টুকরো করে কেটে গরুর গাড়িতে চাপানো হচ্ছিল, তখন বিমলের মানসিক দশা ছিল এক শোকাতুর পিতার মতো:

 * লেখকের বর্ণনায়:

   > *"জগদ্দলের ভাঙা কঙ্কালটা যখন গরুর গাড়িতে বোঝাই হয়ে চলে যাচ্ছিল, বিমল তখন চোখ বুজে রইল। তার মনে হলো, সে যেন তার নিজের বুক থেকে একটা পাঁজর খসিয়ে বিদায় দিচ্ছে।"*

   > 

### অন্তিম দৃশ্য ও নামকরণের চূড়ান্ত সার্থকতা:

গল্পের একদম শেষ দৃশ্যটি নামকরণের সার্থকতাকে এক কালজয়ী ও দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। জগদ্দল চলে যাওয়ার পর বিমল যখন রাস্তার ধারে একাকী, রিক্ত মনে বসে আছে, তখন সে দেখে একটি ছোট শিশু কাদার মধ্যে পড়ে থাকা একটা স্প্রিং-ভাঙা খেলনা মোটর গাড়ির হর্ন বা চোঙা নিয়ে মনের আনন্দে শব্দ করে খেলছে। খেলনাটি ভাঙা, তা থেকে কোনো আসল আওয়াজ বের হয় না—তবুও শিশুটির আনন্দের কোনো সীমা নেই।

এই দৃশ্যটি দেখে বিমলের দীর্ঘদিনের মোহভঙ্গ ঘটে এবং তার শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে ওঠে। সে এক পরম সত্য উপলব্ধি করতে পারে:

১. আনন্দ বা মায়া আসলে লোহার তৈরি ওই নির্জীব ‘জগদ্দল’ গাড়িটার ভেতরে ছিল না।

২. সজীবতা ও ভালোবাসার উৎস ছিল বিমলের নিজের হৃদয়ের ভেতরে।

৩. যন্ত্র ক্ষণস্থায়ী এবং নশ্বর, তা কখনো চিরন্তন সঙ্গী হতে পারে না; কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের যে শিশুসুলভ মায়া, আবেগ বা আনন্দের উৎস—তা শাশ্বত, অবিনশ্বর এবং সম্পূর্ণ ‘অযান্ত্রিক’।

### উপসংহার:

সুতরাং, সমগ্র গল্পটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুবোধ ঘোষ ‘অযান্ত্রিক’ নামকরণের মাধ্যমে এই মহৎ জীবনসত্যটিই প্রতিপন্ন করেছেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে যতই যান্ত্রিক ও জড়বাদী করে তুলতে চাক না কেন, মানুষের মনের আদিম ও শাশ্বত আবেগ-অনুভূতিগুলোকে কখনো ‘যান্ত্রিক’ ছাচে ঢালাই করা যায় না। বাহ্যিকভাবে একটি মোটর গাড়ির গল্প হয়েও এটি আসলে মানুষের হৃদয়ের এক পরম অযান্ত্রিক আকুলতার মনস্তাত্ত্বিক আলেখ্য। যন্ত্রের ওপর মানুষের মনের এই আধিপত্য এবং শেষ পর্যন্ত মোহের অবসান ঘটিয়ে মানবিক চেতনার জয়গান গাওয়ার কারণেই এই গল্পের নামকরণ সর্বাংশে সার্থক, ব্যঞ্জনাধর্মী ও শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...