Skip to main content

ফ্রান্সে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল বিশ্লেষণ করো।

ফ্রান্সে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল বিশ্লেষণ করো। রোবসপিয়ারের ভূমিকা এতে কী ছিল? পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস মাইনর ষষ্ঠ সেমিস্টার।

       ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) একটি অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী এবং বিতর্কিত অধ্যায়। ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৭৯৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ফ্রান্সে জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্বে এই শাসন চলেছিল। আর সেখানে কোনো একক কারণে নয়, বরং তৎকালীন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চরম সংকটময় পরিস্থিতির কারণে এই সন্ত্রাসের শাসন শুরু হয়েছিল।যেখানে সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রেক্ষাপট হিসেবে আমরা দেখতে পাই-

         •বৈদেশিক আক্রমণ ও যুদ্ধঃ ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ যাতে ইউরোপের অন্য দেশে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য অস্ট্রিয়া, প্র Prussia (প্রুশিয়া), ব্রিটেনসহ ইউরোপের রাজতন্ত্রী দেশগুলো ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই বাহ্যিক আক্রমণ ফরাসিদের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করে।

        •অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহঃ ফ্রান্সের ভেতরেও বিপ্লব-বিরোধীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে 'ভেন্দে' (Vendée) অঞ্চলে রাজতন্ত্রী ও যাজকদের নেতৃত্বে এক বিশাল গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

       •অর্থনৈতিক সংকটঃ ফ্রান্সে তখন কাগজের মুদ্রা 'অ্যাসাইনাত'-এর মূল্য মারাত্মকভাবে কমে যায়। তীব্র খাদ্যসংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি এবং কালোবাজারির কারণে সাধারণ মানুষ ও 'সাঁ-কুলেৎ' (শহুরে দরিদ্র শ্রেণী) ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

       •জিয়ন্ডিস্ট ও জ্যাকোবিনদের দ্বন্দ্বঃ বিপ্লবীদের দুটি প্রধান দল—নরমপন্থী 'জিয়ন্ডিস্ট' এবং চরমপন্থী 'জ্যাকোবিন'-দের মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চূড়ান্ত রূপ নেয়। ১৭৯৩ সালের জুনে জিয়ন্ডিস্টদের পতন ঘটিয়ে জ্যাকোবিনরা ক্ষমতা দখল করে।

২. মাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ারের ভূমিকা (Role of Robespierre)

        জ্যাকোবিন নেতা মাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়ার ছিলেন এই সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, "সন্ত্রাস ছাড়া পুণ্য পঙ্গু, আর পুণ্য ছাড়া সন্ত্রাস মারাত্মক।"

     •জননিরাপত্তা কমিটিঃ ফ্রান্সকে রক্ষা করার নামে ১২ সদস্যের এই কমিটিকে একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেওয়া হয়, যার প্রধান নেতা ছিলেন রোবসপিয়ার। এই কমিটিই পুরো ফ্রান্সের শাসন ও দমননীতি নিয়ন্ত্রণ করত।

       •সন্দেহভাজন আইনঃ ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই আইন পাস করা হয়। এর মাধ্যমে বিপ্লবের সামান্যতম বিরোধিতা বা সমালোচনা করলেও যে কাউকে গ্রেপ্তার করার অধিকার দেওয়া হয়।

       •গিলোটিনের নিষ্ঠুর ব্যবহারঃরোবসপিয়ারের নির্দেশে গঠিত 'বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল' (Revolutionary Tribunal) কোনো রকম আপিল বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে গিলোটিনে (শিরশ্ছেদের যন্ত্র) হত্যার নির্দেশ দেয়। রানি মারি আঁতোয়ানেত থেকে শুরু করে বহু বিপ্লবী নেতা (এমনকি রোবসপিয়ারের একসময়ের বন্ধু দাতঁ-ও) এর শিকার হন।

        •চরম নিয়মতান্ত্রিকতাঃ রোবসপিয়ার ফ্রান্সে এক কাল্পনিক 'পুণ্যের প্রজাতন্ত্র' (Republic of Virtue) গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করে 'পরম সত্তার উপাসনা' চালু করেন এবং ক্যালেন্ডার বদলে ফেলেন।

৩. সন্ত্রাসের রাজত্বের ফলাফল

        •ব্যাপক প্রাণহানিঃ সরকারি হিসাব মতে প্রায় ১৭,০০০ মানুষকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। তবে বিচার ছাড়া ও কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর সংখ্যা ধরলে এটি প্রায় ৪০,০০০ ছাড়িয়ে যায়। মজার বিষয় হলো, এর শিকারদের বড় অংশই ছিল সাধারণ কৃষক ও শ্রমিক (প্রায় ৮৫%), যাদের রক্ষার নামে এই বিপ্লব হয়েছিল।

        •বিপ্লবের রক্ষাঃ চরম নির্মম হলেও, এই কঠোর ব্যবস্থার কারণে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয় এবং ফরাসি সেনাবাহিনী বিদেশি শত্রুদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ, সাময়িকভাবে বিপ্লব ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।

       •অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণঃ রোবসপিয়ার সরকার সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দিয়ে (Law of the Maximum) এবং মজুদদারদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে খাদ্যসামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণে এনেছিল, যা দরিদ্র মানুষদের সাময়িক স্বস্তি দেয়।

      •রোবসপিয়ারের পতনঃ সন্ত্রাসের মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে স্বয়ং জ্যাকোবিন নেতারাও নিজেদের জীবন নিয়ে আতঙ্কে থাকতেন। অবশেষে ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই (ফরাসি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৯ থার্মিডোর) কনভেনশনের সদস্যরা রোবসপিয়ারকে বন্দি করেন এবং পরদিন ২৮ জুলাই তাকেই গিলোটিনে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমেই সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল ফরাসি বিপ্লবের একটি ট্র্যাজিক অধ্যায়। বিপ্লবকে বাঁচানোর জন্য যে সন্ত্রাসের জন্ম হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা নিজেই নিজের সন্তানদের গ্রাস করেছিল। রোবসপিয়ারের পতনের পর ফ্রান্সে নরমপন্থীদের শাসন (ডাইরেক্টরি শাসন) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...