Skip to main content

ফ্রান্সের সন্ত্রাসের রাজত্বের (Reign of Terror): প্রেক্ষাপট, রোবসপিয়রের ভূমিকা ও ফলাফল আলোচনা করো।

ফ্রান্সের সন্ত্রাসের রাজত্বের (Reign of Terror): প্রেক্ষাপট, রোবসপিয়রের ভূমিকা ও ফলাফল আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ষষ্ঠ সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে ১৭৯৩ সালের ২রা জুন থেকে ১৭৯৪ সালের ২৭শে জুলাই পর্যন্ত সময়কালকে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলা হয়। জিরোন্ডিন দলের পতনের পর জ্যাকোবিন দল রোবসপিয়রের নেতৃত্বে ফ্রান্সে এক একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে। এই শাসনের মূল ভিত্তি ছিল-

 "সন্ত্রাসের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করা।"

 •সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রবর্তনের কারণ বা প্রেক্ষাপট•

 ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্বের ফলে এক বহুমুখী সংকট ঘনীভূত হয়। যার ফলেই এই কঠোর শাসনের উদ্ভব ঘটেছিল। আর সেই শাসনে আমরা দেখতে পাই যে-

 ১) বৈদেশিক সংকটঃইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া ও স্পেনসহ ইউরোপীয় শক্তিবর্গ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে 'প্রথম শক্তিজোট' গঠন করে। ফরাসি বাহিনী একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হতে থাকে, যা বিপ্লবের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে।

 ২)অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধঃফ্রান্সের দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্তে (যেমন-ভঁদি ও লিয়ঁ) রাজতন্ত্রীরা বৈপ্লবিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে।অর্থাৎ ফ্রান্সের অভ্যন্তরে রাজতন্ত্রী ও জিরোন্ডিনপন্থীরা বিপ্লবের বিরোধিতা শুরু করে। বিশেষ করে ভঁদি (Vendée) অঞ্চলে তীব্র গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

 ৩)অর্থনৈতিক বিপর্যয়ঃ মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যাভাব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অগ্নিমূল্য সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। অ্যাসাইন্যাট (কাগজি মুদ্রা)-র অবমূল্যায়ন, কালোবাজারি এবং খাদ্যশস্যের তীব্র সংকটে সাধারণ মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

৪)বিপ্লবের সুরক্ষাঃ প্যারিসের উগ্র জনতা বা 'সাঁ-কুলোৎ' (Sans-culottes)-রা দাবি জানায় যে, বিপ্লব বিরোধীদের কঠোর হস্তে দমন না করলে সাধারণ মানুষের মুক্তি মিলবে না।আর সেকারণেই ১৭৯৩ সালের ২রা জুন জিরোন্ডিনদের পতনের পর জ্যাকোবিনরা ক্ষমতা দখল করে এবং বিপ্লব বিরোধী শক্তিকে নির্মূল করতে 'সন্ত্রাস'কে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে।।আর সেখানে সন্ত্রাসের শাসন কাঠামো ছিল-

        রোবসপিয়রের নেতৃত্বে শাসন পরিচালনার জন্য জননিরাপত্তা কমিটি গঠন হয়।যেটি ছিল প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র।তবে রোবসপিয়রের নেতৃত্বে ১২ জন সদস্যের এই কমিটি শাসন পরিচালনা করত। এরই পাশাপাশি সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়আর এটি ছিল পুলিশের শাসন ব্যবস্থার মতো। দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা ও গুপ্তচরবৃত্তির তদারকি করত এই কমিটি। অতঃপর ছিল- বিপ্লবী আদালত।যেখানে কোনো বিচারক ছাড়াই অভিযুক্তদের দ্রুত বিচারের জন্য এই আদালত গঠিত হয়। এখানে কোনো আপিলের ব্যবস্থা ছিল না।

      •রোবসপিয়রের ভূমিকা ও কার্যকলাপ•

ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়র ছিলেন এই সময়ের প্রধান পরিচালক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ফ্রান্সকে রক্ষা করতে হলে 'সন্ত্রাস' ও 'পুণ্য'এর মেলবন্ধন প্রয়োজন। আর সেই মেলবন্ধনের জন্য তৈরি হয়-

 ১)সন্দেহের আইনঃ ১৭৯৩ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর এই কুখ্যাত আইন পাস হয়। এই আইনানুসারে যে কেউ—যাকে বিপ্লবের বিরোধী মনে করা হবে-তাকেই গ্রেফতার করা যেত।

২)বিরোধীদের নির্মূলঃপ্রথমে রানী মারি আঁতোয়ানেত এবং পরে জিরোন্ডিন নেতাদের গিলোটিনে হত্যা করা হয়। এমনকি নিজের দলের সহকর্মী দাঁতো (Danton) এবং হিবায়ের্টকেও তিনি রেহাই দেননি।

 ৩)প্রজাতন্ত্রী মনোভাবঃ রোবসপিয়র সমাজ থেকে রাজতন্ত্রের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে নতুন ক্যালেন্ডার এবং মাপজোখের নতুন পদ্ধতি (Metric system) চালু করেন। তিনি খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করে 'পরম সত্তার উপাসনা' (Cult of the Supreme Being) প্রবর্তন করেন।

       •সন্ত্রাসের রাজত্বের ফলাফল•

        ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসে ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) বলা হয়। রোবেসপিয়রের নেতৃত্বে পরিচালিত এই শাসনব্যবস্থা যেমন রক্তক্ষয়ী ছিল, তেমনি এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামাজিক ফলাফল ছিল।আর সেই ফলাফল গুলি হলো-

 • দেশরক্ষাঃ কঠোর সেনানিয়ন্ত্রণ ও বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার (Levée en masse) ফলে ফরাসি সেনাবাহিনী শক্তিশালী হয় এবং বৈদেশিক শত্রুদের পরাজিত করে।সেইসাথে মূল্য নিয়ন্ত্রণ হিসেবে 'আইন অফ ম্যাক্সিমাম' প্রবর্তনের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

 • অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষাঃসন্ত্রাসের রাজত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমন করা। তৎকালীন সময়ে জিরন্ডিস্ট এবং রাজতন্ত্রপন্থীরা যে বিদ্রোহ শুরু করেছিল, তা কঠোর হাতে দমন করা হয়। এর ফলে ফ্রান্স এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়।

গণহত্যাঃ মাত্র এক বছরে ফ্রান্সে সরকারিভাবে প্রায় ১৭,০০০ এবং বেসরকারিভাবে প্রায় ৪০,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়। গিলোটিন বা 'জাতীয় ক্ষুর' হয়ে ওঠে বিভীষিকার প্রতীক।আসলে সাম্য ও স্বাধীনতার কথা বলে রোবসপিয়র প্রকৃতপক্ষে এক ভয়াবহ একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন।

থার্মিডোরিয় প্রতিক্রিয়াঃসন্ত্রাস যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন জ্যাকোবিন দলের নেতারাই নিজেদের প্রাণের ভয়ে রোবসপিয়রের বিরুদ্ধে একজোট হন। ১৭৯৪ সালের ২৭শে জুলাই (ফরাসি ক্যালেন্ডারের ৯ই থার্মিডোর) কনভেনশনে রোবসপিয়রের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় এবং তাঁকে বন্দি করা হয়।২৮শে জুলাই রোবসপিয়রের মস্তকচ্ছেদের মাধ্যমেই সন্ত্রাসের অবসান ঘটে।একে ইতিহাসে 'থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া' বলা হয়।

নেপোলিয়নের উত্থানের পথঃসন্ত্রাসের রাজত্বের চরম বিশৃঙ্খলা এবং পরবর্তী দুর্বল ডিরেক্টরি শাসন ফরাসি জনগণের মনে এক শক্তিশালী একনায়কের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে। এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই মূলত নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-এর ক্ষমতায় আসার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল।

        ঐতিহাসিক ডেভিড থমসন-এর মতে, সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল এক "অপরিহার্য ট্র্যাজেডি"। একদিকে এটি বিপ্লবকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, কিন্তু অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষের রক্তপাতের ফলে বিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছিল।আসলে সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল এক দ্বি-ধারী তলোয়ার। একদিকে এটি বিপ্লবকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, অন্যদিকে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের রক্তপাতে বিপ্লবের মানবিক আবেদনকে কলঙ্কিত করেছিল।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং shesher kabita Sundarbon YouTube channel SAMARESH sir 



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...