Skip to main content

গৃহদাহ' উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টারের বাংলা মেজর DS-13

         আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সাহিত্যে নামকরণের নানাবিধ পদ্ধতি রয়েছে—কখনও তা চরিত্রপ্রধান, কখনও ঘটনাকেন্দ্রিক, আবার কখনও তা ব্যঞ্জনামূলক বা প্রতীকী। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'গৃহদাহ' (১৯২০) উপন্যাসটির নামকরণ মূলত একটি গভীর ভাবব্যঞ্জক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতীকী নামকরণ। উপন্যাসটিতে একদিকে যেমন সামাজিক ও পারিবারিক ভাঙনের এক বাস্তব চিত্র রূপায়িত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, কামনা-বাসনা এবং সংস্কারের দ্বন্দ্বে অন্তরের পবিত্র গৃহটি কীভাবে ছারখার হয়ে যায়, তার এক নিখুঁত চালচিত্র অঙ্কিত হয়েছে।আর এই দ্বিমুখী প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটির নামকরণের সার্থকতা নিম্ন সূত্রাকারে আলোচনা করা হলো-

         'গৃহদাহ' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ঘরের আগুন’ বা ‘বাড়ি পুড়ে যাওয়া’। কিন্তু শরৎচন্দ্রের কবিমানস কেবল ইঁট-কাঠ-পাথরের তৈরি জড় গৃহের দহন দেখিয়ে ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন মানুষের হৃদয়-গৃহের অলক্ষ্য দহনকে। তাই এই নামকরণের সার্থকতা বিচার করতে গেলে আমাদের দুটি দিক আলোচনা করতে হবে:

         ১. বাস্তব বা স্থূল ঘটনাগত দিক থেকে, যেটি বাহ্যিক গৃহদাহ এর নামান্তর।

        ২. প্রতীকী বা মনস্তাত্ত্বিক ভাবগত দিক থেকে যেটি অভ্যন্তরীণ গৃহদাহ এর নামান্তর।

      ১. বাস্তব ঘটনাগত দিক এবং বাহ্যিক গৃহদাহ।উপন্যাসের কাহিনীর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনে একটি বাস্তব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্রাহ্ম সমাজের উগ্রতা থেকে আত্মরক্ষা করে এবং সমস্ত সামাজিক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে অচলা যখন সনাতনপন্থী মহিমকে ভালোবেসে বিয়ে করল, তখন তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুটা ছিল শান্ত ও স্নিগ্ধ। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই মহিমের গ্রামের মাটির কুটিরটি আকস্মিক আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।আসলে-

        এই বাস্তব গৃহদাহ কেবল মহিমকে গৃহহীন করেনি, তা মহিম ও অচলার সাজানো দাম্পত্যের ছন্দটি ভেঙে দেয়। এই গৃহহীনতার সুযোগ নিয়েই সুরেশ তাদের জীবনে তীব্রভাবে প্রবেশ করার এবং সাহায্য করার পথ খুঁজে পায়। গ্রামের বাড়ি পুড়ে না গেলে মহিমকে সস্ত্রীক সুরেশের দেওয়া বাসস্থানে আশ্রয় নিতে হতো না, এবং কেদারপুরে গিয়ে সুরেশের কুটিল চক্রান্তের জালে অচলাকে পড়তে হতো না। সুতরাং, কাহিনীর মোড় পরিবর্তন এবং ট্র্যাজেডিকে ত্বরান্বিত করার পেছনে এই বাস্তব ‘গৃহদাহ’ এক অমোঘ অনুঘটক।

       ২. প্রতীকী বা মনস্তাত্ত্বিক দিক এবং অন্তর-গৃহের দহনশরৎচন্দ্রের কাছে ‘গৃহ’ শব্দটির তাৎপর্য আরও গভীর। গৃহ কেবল চার দেওয়ালের সীমানা নয়; মানুষের লালিত সংস্কার, দাম্পত্যের পবিত্রতা, পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং মনের শান্তিই হলো মানুষের আসল ‘অন্তর-গৃহ’। উপন্যাসের মূল তিনটি চরিত্র—অচলা, সুরেশ ও মহিম—কীভাবে তাদের নিজেদের ভুলের আগুনে সেই অন্তর-গৃহকে পুড়িয়ে খাক করেছে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-

      ক) অচলার অন্তরের দ্বন্দ ও আত্মদহন।উপন্যাসের মূল ট্র্যাজেডি আবর্তিত হয়েছে অচলাকে কেন্দ্র করে। অচলা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও সংস্কারমুক্ত ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা হলেও, অবচেতনে সে ভারতীয় সনাতন নারীসুলভ দাম্পত্য ধর্মের প্রতি আজন্ম এক টান অনুভব করত। সে মহিমের শান্ত, সংযত ব্যক্তিত্বকে ভালোবেসেছিল, কিন্তু সুরেশের উগ্র, প্রলয়ঙ্করী ও সর্বগ্রাসী ভালোবাসা তাকে এক মারাত্মক দোলাচলের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। সে না পেরেছে মহিমের প্রতি তার নিষ্ঠাকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে, না পেরেছে সুরেশের তীব্র আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে। সুরেশ যখন তাকে জোরপূর্বক কেদারপুরে নিয়ে যায়, তখন অচলার মনে হয়েছে তার পবিত্র নীতিবোধ ও নারীত্বের আদর্শ চিরতরে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নিজের এই তীব্র মানসিক যন্ত্রণা প্রকাশ করতে গিয়ে সে সুরেশকে বলেছিল-

 "আজন্মকাল যে সংস্কার মজ্জার ভেতরে ঢুকেছে, তাকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায় না সুরেশবাবু। ... তুমি আমার ইহকাল পরকাল দুই-ই নষ্ট করেছ।"

         আসলে অচলা সুরেশের সঙ্গে বাস করেও মনে মনে মহিমকেই ধ্যান করেছে, আবার মহিমের কথা ভেবে অনুশোচনার আগুনে দিনরাত দগ্ধ হয়েছে। এই অন্তহীন আত্মদহনই অচলা চরিত্রটিকে এক জীবন্ত ‘গৃহদাহ’-এর প্রতীক করে তুলেছে।

      খ) সুরেশের কামনার আগুন ও আত্মবিনাশ।সুরেশ চরিত্রটি হলো প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের মতো। তার ভালোবাসা ছিল অধিকারপ্রমত্ত, অন্ধ এবং কামনাকাতর। বন্ধুর স্ত্রী অচলাকে পাওয়ার অন্ধ মোহে সে নিজের বিবেক, নৈতিকতা এবং বন্ধুত্বের পবিত্র গৃহটিকে পুড়িয়ে খাক করে ফেলেছিল। কিন্তু অচলাকে জোর করে লাভ করার পরেও সুরেশ এক মুহূর্তের জন্যও মানসিক শান্তি পায়নি। অচলার দেহ সে পেয়েছিল, কিন্তু তার মন কোনোদিন পায়নি। এই অতৃপ্তি এবং তীব্র পাপবোধের আগুন তাকে তিলে তিলে পুড়িয়েছে। উপন্যাসের শেষে প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে সুরেশের যে মৃত্যু ঘটে, তা আসলে তার ভেতরের জ্বলতে থাকা কামনার আগুনেরই এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ। পরগৃহ ধ্বংস করতে গিয়ে সুরেশ নিজের জীবন-গৃহকেই ছাই করে দিয়েছিল।

    গ) মহিমের নীরব বেদনা ও শূন্যতার দহন।মহিমকে আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত শান্ত, স্থিতপ্রজ্ঞ এবং উদাসীন মনে হলেও, তার বুকের গভীরেও দহনের আগুন কম ছিল না। সে অচলাকে গভীরভাবে ভালোবাসত। কিন্তু নিজের পরম বন্ধু সুরেশের বিশ্বাসঘাতকতা এবং স্ত্রী অচলার পদস্খলন তার সাজানো সংসারকে শ্মশানে পরিণত করে দেয়। মহিম বাইরে কোনো চিৎকার বা হাহাকার করেনি, কিন্তু তার এই মৌনতা ও নীরবতা তার ভেতরের তীব্র মানসিক দহন ও শূন্যতাকেই প্রমাণ করে।

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,উপন্যাসের সমাপ্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুরেশের মৃত্যুর পর মহিম যখন অচলাকে ফেলে একা রেলে চড়ে চলে যায়, তখন অচলার সামনে পড়ে থাকে এক অন্তহীন অন্ধকার ও মহাশূন্যতা। তার আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো গৃহ আর অবশিষ্ট নেই—না বস্তুগত, না মানসিক।আসলে-

        শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং ভুল বোঝাবুঝির আগুন কীভাবে একটি সুন্দর সমাজ ও সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের ‘গৃহ’কে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে। মহিমের ঘরের আগুন ছিল কেবলই বাহ্যিক উপলক্ষ্য, আসল দহন ঘটেছে মানুষের মনের অন্দরমহলে। তাই বিষয়বস্তু, চরিত্রায়ণ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার দিক থেকে বিচার করলে উপন্যাসের 'গৃহদাহ' নামকরণটি সর্বাংশে সার্থক, গভীর এবং রসোত্তীর্ণ হয়েছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা অনার্স (DSE3/4) সাজেশন ২০২৫

       West Bengal State University                                       BA Honours, 6th Semester                                         SUGGESTION 2025                                                      BNGA,DSE05T( DSE3/4)  • বাংলা কথাসাহিত্যঃ মন্বন্তর, দাঙ্গা ও দেশভাগ• একক-১(২০২১) ক) দেশভাগের ইতিহাসের বাস্তব রূপ বাংলা সাহিত্যে  কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে কয়েকটি উপন্যাস অনুসরণে তার পরিচয় দাও। • ১৯৪৬ দাঙ্গা রাজনীতির ট্রাজেডি বাংলা ছোটগল্পের পরিসরে কিভাবে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি রচনা অবলম্বনে আলোচনা করো। (২০২২) পঞ্চাশের মন্বন্তরের বাস্তব বর্ণনা করে বাংলা উপন্যাসে তার কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করো। •দেশভাগের ক...

ইতিহাস (3rd Semester) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর।

 তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর)। ১)বন্দেগান-ই-চাহালগানি বলতে কী বোঝায়? •উত্তরঃবন্দেগান-ই-চাহালগান বলতে চল্লিশ জন তুর্কি ও অ-তুর্কি দাসদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে বোঝায়। এই বাহিনীকে ডাল চালিশা বা তুরকান-ই- চাহালগানি নামে ডাকা হতো। ২)আমির খসরু কে ছিলেন? •উত্তরঃ আমির খসরু ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক বা আরেফ নিজামউদ্দিন আওলিয়ার ছাত্র এবং অন্যতম প্রধান খলিফা। যাঁকে 'ভারতের তোতা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ৩) মহরানা প্রতাপ কে ছিলেন?  •উত্তরঃ মেবারের শিশোদিয়া রাজবংশের একজন হিন্দু রাজপুত রাজা ছিলেন মহারানা প্রতাপ সিং। যিনি রাজপুতদের বীরত্ব ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। বহু বছর ধরে তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে লড়াই করেন। ৪) জায়গীরদারী সংকট কী? •উত্তরঃ জায়গিরদারী সংকট ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে জমি বা জায়গিরের অভাব দেখা দিয়েছিল। যার ফলে প্রশাসনিক খরচ মেটানো এবং যুদ্ধের খরচ বহন করা সম্ভব হতো না। ৫) দাক্ষিণাত্য ক্ষত কী? •উত্তরঃ দাক্ষিণাত্য ক্ষত বলতে ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীত...