Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ষষ্ঠ সেমিস্টারের ইতিহাস মাইনর (History Minor) পরীক্ষার বড় প্রশ্ন (১৫ নম্বর) বা বিস্তারিত আলোচনার উপযোগী করে নোটটি নিচে আরও তথ্যসমৃদ্ধভাবে পুনর্গঠিত করে দেওয়া হলো।

# ফরাসি বিপ্লবের দুই স্তম্ভ: টেনিস কোর্টের শপথ ও বাস্তিল দুর্গের পতন

### ১. টেনিস কোর্টের শপথ (২০শে জুন, ১৭৮৯)

**প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সংকট:**

ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই ১৭৮৯ সালের ৫ই মে ভার্সাইয়ে এস্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ডাকেন। তৃতীয় সম্প্রদায়ের (সাধারণ মানুষ) দাবি ছিল ‘মাথাপিছু ভোট’ (One Man One Vote), কিন্তু রাজা ও প্রথম দুই সম্প্রদায় ‘শ্রেণিভিত্তিক ভোট’-এর দাবিতে অনড় থাকে। এই অচলাবস্থা কাটানোর জন্য ১৭ই জুন তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজেদের **‘জাতীয় সভা’** (National Assembly) হিসেবে ঘোষণা করেন। এটি ছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ।

**শপথের বিবরণ:**

২০শে জুন তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখেন সেটি তালাবন্ধ। তারা মনে করেন রাজা তাদের সভা ভেঙে দিতে চান। উত্তেজিত প্রতিনিধিরা নিকটবর্তী এক ইনডোর টেনিস খেলার মাঠে সমবেত হন। এখানে প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী **বেইলি**-র সভাপতিত্বে তারা শপথ নেন যে— **“যতদিন ফ্রান্সের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সংবিধান রচিত না হচ্ছে, ততদিন তারা বিচ্ছিন্ন হবেন না এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সমবেত হবেন।”**

**শপথের গুরুত্ব:**

 * **সার্বভৌমত্বের ধারণা:** এই শপথ প্রমাণ করে যে সার্বভৌম ক্ষমতা রাজার হাতে নয়, বরং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত।

 * **মিরার্বোর ভূমিকা:** যখন রাজকীয় দূত সভা ত্যাগের আদেশ দেন, তখন কাউন্ট মিরার্বো দর্পভরে বলেছিলেন— *“আমরা এখানে জনগণের ইচ্ছায় সমবেত হয়েছি এবং বেয়নেটের খোঁচা ছাড়া আমাদের এখান থেকে কেউ সরাতে পারবে না।”*

 * **বিপ্লবের আইনি জয়:** শেষ পর্যন্ত ২৭শে জুন রাজা তিন সম্প্রদায়ের যৌথ অধিবেশন মেনে নিতে বাধ্য হন। এটি ছিল বিপ্লবীদের প্রথম বড় জয়।

### ২. বাস্তিল দুর্গের পতন (১৪ই জুলাই, ১৭৮৯)

**পতনের কারণসমূহ:**

টেনিস কোর্টের শপথের ফলে রাজা নতি স্বীকার করলেও তলে তলে সৈন্য সমাবেশ শুরু করেন। জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী **নেকার**-কে (Jacques Necker) পদচ্যুত করলে প্যারিসের জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা মনে করেছিল রাজা অস্ত্রবলে জাতীয় সভা ভেঙে দেবেন।

**আক্রমণ ও পতন:**

১৪ই জুলাই এক বিশাল জনতা আগ্নেয়াস্ত্রের খোঁজে রাজকীয় কারাগার ও অস্ত্রাগার **বাস্তিল দুর্গ** আক্রমণ করে। দুর্গের রক্ষী দ্য লনে (De Launay) প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। জনতা দুর্গ ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং কয়েদিদের মুক্ত করে।

**ঐতিহাসিক গুরুত্ব:**

১. **পুরাতনতন্ত্রের অবসান:** বাস্তিল ছিল স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক। এর পতন মানে ছিল ফ্রান্সে দীর্ঘদিনের শোষণমূলক ‘অ্যানসিয়েন রেজিম’-এর পতন।

২. **গণশক্তির উত্থান:** এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কেবল বুদ্ধিজীবী বা বুর্জোয়া নয়, সাধারণ শ্রমিক ও জনতাও বিপ্লবের প্রধান শক্তি।

৩. **জাতীয় রক্ষীবাহিনী:** বিপ্লব রক্ষার জন্য লাফায়েতের নেতৃত্বে 'ন্যাশনাল গার্ড' গঠিত হয় এবং সাদা, লাল ও নীল রঙের ত্রিবর্ণ পতাকাকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

৪. **রাজার আত্মসমর্পণ:** ১৫ই জুলাই রাজা প্যারিসে এসে জাতীয় সভাকে স্বীকৃতি দেন এবং নেকারকে পুনর্বহাল করেন।

### ৩. এই দুই ঘটনার সমন্বিত ফলাফল ও সার্থকতা

**সামন্ততন্ত্রের বিলোপ (৪ঠা আগস্ট):**

বাস্তিল পতনের ঢেউ গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে কৃষকরা জমিদারদের বাড়ি আক্রমণ করে। এই গণবিদ্রোহের চাপে পড়ে ৪ঠা আগস্ট জাতীয় সভা এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় ফ্রান্সে **সামন্ততন্ত্র, ভূমিদাস প্রথা ও ধর্মীয় কর (Tithe) বিলুপ্ত** করে।

**মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা (২৬শে আগস্ট):**

এই প্রেক্ষাপটেই ফরাসি সংবিধানের প্রস্তাবনা হিসেবে ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা’ (Declaration of the Rights of Man and of the Citizen) গৃহীত হয়, যা আধুনিক বিশ্বের গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে।

### উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, **টেনিস কোর্টের শপথ** ছিল একটি ‘আইনি ও মানসিক বিপ্লব’, আর **বাস্তিল দুর্গের পতন** ছিল তার ‘বাস্তব ও প্রায়োগিক রূপ’। এই দুই ঘটনার মেলবন্ধনেই ফরাসি বিপ্লব কেবল ফ্রান্সের নয়, সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

**পরামর্শ:**

পরীক্ষায় যদি ১৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন আসে, তবে এই তিনটি পয়েন্টকে (শপথ, পতন এবং ফলাফল) ধারাবাহিকভাবে লিখলে আপনার ছাত্র-ছাত্রীরা খুব ভালো নম্বর পাবে। এছাড়াও টেনিস কোর্টের শপথের ওপর **জ্যাঁ লুই ডেভিড**-এর আঁকা বিখ্যাত ছবিটির প্রসঙ্গ টেনে আনলে উত্তরের মান আরও বাড়বে।

আপনার কি এই উত্তরের জন্য কোনো **বিবলিওগ্রাফি বা রেফারেন্স বইয়ের** তালিকা প্রয়োজন? (যেমন: ডেভিড থমসন বা ফিশারের বই)।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...