Skip to main content

 কামরূপী বা কামরূপি অসমীয়া হলো অসমীয়া ভাষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন উপভাষা। ভৌগোলিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি অসমের পশ্চিমাঞ্চলে প্রচলিত। নিচে কামরূপী উপভাষার অঞ্চল ও বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো:

কামরূপী উপভাষার সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং জীবন্ত নিদর্শন পাওয়া যায় নিম্ন অসমের লোকসংস্কৃতিতে:

​আইনাম (Ainaam): বসন্ত বা গুটিবসন্ত রোগের সময় শান্তিনির্ভর যে স্তুতিমূলক গান গাওয়া হয়, তা মূলত কামরূপী ভাষার সুরে ও শব্দভাণ্ডারে সমৃদ্ধ।

​বিয়া নাম (Biya Naam): বিয়ের অনুষ্ঠানে মহিলারা যে গানগুলো গান, তার অধিকাংশতেই কামরূপী আঞ্চলিক ভাষার স্পষ্ট ছাপ থাকে। এই গানগুলোতে স্থানীয় উপভাষার মাধুর্য ও বাগধারা ফুটে ওঠে।

### ১. প্রচলিত অঞ্চল

কামরূপী উপভাষা প্রধানত অসমের নিম্ন অসম (Lower Assam) অঞ্চলে প্রচলিত। এর বিস্তার মূলত নিম্নোক্ত জেলাগুলোতে দেখা যায়:

 * **কামরূপ (গ্রামীণ ও মেট্রোপলিটন)**

 * **বরপেটা**

 * **নলবাড়ি**

 * **বঙাইগাঁও**

 * **দরং** জেলার পশ্চিমাংশ।

### ২. ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও নিদর্শন

কামরূপী উপভাষার কিছু স্বতন্ত্র ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে মান্য অসমীয়া (Central Assam dialect) থেকে আলাদা করে।

#### ক) ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Phonological Features)

 * **মহাপ্রাণ ধ্বনির অল্পপ্রাণীকরণ:** কামরূপী উপভাষায় অনেক সময় শব্দের মাঝখানে বা শেষে থাকা মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলো অল্পপ্রাণ হয়ে যায়।

   * *উদাহরণ:* ‘হাত’ (Hand) শব্দটিকে অনেক সময় ‘হাদ’ বা ‘হাত’ উচ্চারণে তেমন জোর দেওয়া হয় না।

 * **স্বরধ্বনির পরিবর্তন:** অনেক ক্ষেত্রে মান্য অসমীয়ার তুলনায় স্বরধ্বনির হেরফের ঘটে। যেমন ‘অ’ কারের উচ্চারণ কিছুটা ‘ও’ কারের দিকে ঝুঁকে থাকে।

   * *উদাহরণ:* ‘ঘর’ (House) শব্দটিকে উচ্চারণ করা হয় ‘ঘোর’-এর কাছাকাছি।

 * **হ-কার লোপ:** অনেক ক্ষেত্রে শব্দের শুরুতে বা মাঝে ‘হ’ ধ্বনিটি দুর্বল হয়ে পড়ে বা লুপ্ত হয়।

#### খ) রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Morphological Features)

 * **বিভক্তির প্রয়োগ:** কামরূপী উপভাষায় বিশেষ্য পদের সঙ্গে যুক্ত বিভক্তিগুলো মান্য অসমীয়া থেকে ভিন্ন।

   * *উদাহরণ:* মান্য অসমীয়ায় কর্মকারকে ‘ক’ বিভক্তি যুক্ত হয়, কিন্তু কামরূপীতে ‘ক’ ছাড়াও ‘ও’ বা ‘এ’ বিভক্তির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।

 * **সর্বনামের ব্যবহার:** ‘মই’ (আমি) এর জায়গায় ‘মুই’ এবং ‘তুমি’ এর জায়গায় ‘তুই’ বা ‘তুমি’র আঞ্চলিক রূপের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।

 * **ক্রিয়াপদের রূপ:** ক্রিয়াপদ গঠনের ক্ষেত্রে কামরূপীতে বিশেষ কিছু প্রত্যয় ব্যবহৃত হয়।

   * *উদাহরণ:* ‘খাইয়াছোঁ’ বা ‘খাচ্ছি’র পরিবর্তে ‘খাইছো’ বা ‘খাইছোঁ’ এর মতো আঞ্চলিক টান থাকে। ‘যাইম’ (যাবো) - এটি কামরূপীর একটি অত্যন্ত পরিচিত নিদর্শন।

#### গ) বাক্যতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য (Syntactic Features)

 * **বাক্য গঠন:** কামরূপী উপভাষায় বাক্যের গঠনশৈলী কিছুটা সরল এবং এতে স্থানীয় লোকজ ভাষার প্রভাব প্রবল। বিশেষ করে প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘নে’ বা ‘কি’ এর ব্যবহার ভিন্নভাবে হয়।

   * *উদাহরণ:* ‘ভাত খাইলা নে?’ (ভাত খেয়েছ?) - এখানে ‘খাইলা’ ক্রিয়ার রূপটি সরাসরি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য বহন করে।

### ৩. ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব

কামরূপী উপভাষাকে অনেকেই প্রাচীন অসমীয়া ভাষার একটি ধারক মনে করেন। ড. বাণীকান্ত কাকতিসহ অনেক ভাষাবিদ কামরূপী উপভাষার সঙ্গে মৈথিলি ও মাগধী প্রাকৃতের একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করেছেন। এটি শুধুমাত্র একটি উপভাষা নয়, বরং অসমীয়া জাতির নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

**আপনার কি কামরূপী উপভাষার সাহিত্যিক রূপ বা এর ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার প্রয়োজন আছে?**


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...