জন অস্টিনের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বটি ব্যাখ্যা ও বিচার করো(Austin’s Theory of Sovereignty)। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনোর ইউনিট ২
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ আইনবিদ জন অস্টিন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Lectures on Jurisprudence' (১৮৩২)-এ সার্বভৌমত্বের 'একত্ববাদী' (Monistic) মতবাদ প্রচার করেন। আর সেখানে অস্টিন মনে করেন-
"যদি কোনো নির্দিষ্ট উচ্চতর ব্যক্তি (Determinate Superior) কোনো সমাজে অন্য কোনো উচ্চতর ব্যক্তির আজ্ঞাবহ না হয়ে, বরং ওই সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছ থেকে স্বভাবজাত অভ্যাসগত আনুগত্য লাভ করেন, তবে ওই নির্দিষ্ট উচ্চতর ব্যক্তিই হলেন সার্বভৌম।"
আসলে তিনি মনে করেন- যদি কোনো নির্দিষ্ট সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছ থেকে স্বাভাবিক আনুগত্য (Habitual Obedience) লাভ করেন, তবে সেই ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিই হলেন সেই সমাজের সার্বভৌম এবং সেই সমাজটি একটি রাজনৈতিক ও স্বাধীন সমাজ।
•অস্টিনের সার্বভৌম তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. নির্দিষ্ট মানবীয় ঊর্ধ্বতনঃঅস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্ব কোনো অস্পষ্ট বা কাল্পনিক ধারণা নয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির হাতে ন্যস্ত থাকে।অর্থাৎ-
অস্টিনের মতে, সার্বভৌমত্বের অধিকারী কোনো অদৃশ্য শক্তি নয়, বরং একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
২. স্বাভাবিক আনুগত্যঃ সমাজের অধিকাংশ মানুষ যখন দীর্ঘকাল ধরে কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে চলার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়, তখন সেই কর্তৃত্বই সার্বভৌমত্ব লাভ করে।অর্থাৎ-
সমাজের অধিকাংশ মানুষ সেই নির্দিষ্ট উচ্চতর ব্যক্তির নির্দেশ মেনে চলতে অভ্যস্ত।
৩. আনুগত্যহীনতাঃ সার্বভৌম ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য কারো আদেশের অধীন নয়। অর্থাৎ, সার্বভৌম নিজে স্বাধীন এবং অন্য কারো নির্দেশে পরিচালিত হয় না।
৪. আইন হলো আদেশের সমষ্টিঃঅস্টিনের মতে, “আইন হলো সার্বভৌম ব্যক্তির আদেশ (Law is the command of the sovereign)”। এই আদেশের পেছনে থাকে শাস্তির ভয় বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা (Sanction)।অষ্টিনের মতে-
"আইন হলো সার্বভৌম শাসকের আদেশ।" অর্থাৎ, সার্বভৌম শক্তির আদেশ অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
৫. সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য ও অসীমঃ অস্টিনের ধারণায় সার্বভৌম ক্ষমতাকে ভাগ করা যায় না। এটি আইনত অসীম এবং নিরঙ্কুশ। সার্বভৌম ব্যক্তি নিজেই আইনের উৎস, তাই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে।
•অস্টিনের সার্বভৌম তত্ত্বের সমালোচনা
যদিও অস্টিনের তত্ত্বটি অত্যন্ত সুসংহত এবং আইনগত স্পষ্টতা প্রদান করে, তবুও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এটি বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে। আর সেই সমালোচনায় আমরা দেখতে পাই-
•ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবঃ অস্টিন আইনের উৎস হিসেবে কেবলমাত্র সার্বভৌম ব্যক্তির আদেশকে দেখেছেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক আইন (যেমন: প্রথা, রীতিনীতি) সার্বভৌম ব্যক্তির আদেশের বহু আগে থেকেই সমাজে প্রচলিত ছিল।
•গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরোধীঃগণতন্ত্রে সার্বভৌমত্ব জনগণের হাতে থাকে। অস্টিনের তত্ত্বে সার্বভৌমত্বের একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রযোজ্য নয়।
•আইন ও নৈতিকতার বিচ্ছেদঃ অস্টিন আইন থেকে নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে আইন কেবল শাস্তির ভয়ে মানুষ মেনে চলে না, তার পেছনে ন্যায়বোধ ও নৈতিক সমর্থনও কাজ করে।
•যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় অচলঃযুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টিত থাকে। অস্টিনের মতে সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে সংঘাতপূর্ণ।
•আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষাঃঅস্টিনের মতে, আন্তর্জাতিক আইন সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে না। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থাগুলোর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
পরিশেষে আমাদের বলতেই হয় যে, তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও অস্টিনের তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ । যেখানে তিনি সার্বভৌমত্বকে আইনের সাথে যুক্ত করে রাষ্ট্র ও আইনের একটি যৌক্তিক কাঠামো প্রদান করেছেন। আধুনিক আইন ব্যবস্থায় ‘আইনগত সার্বভৌমত্ব’ বা ‘পার্লামেন্টারি সার্বভৌমত্ব’-এর ধারণাকে বুঝতে অস্টিনের তত্ত্ব আজও প্রাসঙ্গিক।
এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং 'Shesher Kabita Sundarbon" YouTube channel Samaresh Sir
Comments
Post a Comment