শেষের কবিতা’ উপন্যাসে বর্ণিত প্রেমতত্ত্বের স্বরূপ ব্যাখ্যা করো। ‘ঝরনার জল’ ও ‘ঘড়ায় তোলা জল’-এর রূপকটি প্রেমের বিচারে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?" আলোচনা করো।
‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে বর্ণিত প্রেমতত্ত্বের স্বরূপ ব্যাখ্যা করো। ‘ঝরনার জল’ ও ‘ঘড়ায় তোলা জল’-এর রূপকটি প্রেমের বিচারে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?" আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের মূল উপজীব্য হলো প্রেমের নবমূল্যায়ন। আসলে এখানে প্রেম কেবল হৃদয়ের আবেগ নয়, বরং বুদ্ধির সঙ্গে তার এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে। এই উপন্যাসের প্রেমতত্ত্ব বুঝতে হলে অমিত রায়ের দুটি বিখ্যাত রূপক বোঝা জরুরি। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই যে -
১'ঘড়ায় তোলা জল'যা সামাজিক ও অভ্যস্ত প্রেম হিসেবে চিহ্নিত।আসলে অমিতের জীবনে কেতকীর সঙ্গে যে সম্পর্ক, তাকে সে ‘ঘড়ায় তোলা জল’হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যেখানে-
ঘড়ায় তোলা জল যেমন পাত্রের মধ্যে স্থির থাকে, তেমনি সামাজিক গণ্ডিতে আবদ্ধ প্রেম বা দাম্পত্য জীবন একসময় অভ্যাসের দাস হয়ে পড়ে। সেখানে উত্তেজনার চেয়ে নিরাপত্তার বোধ বেশি থাকে।তবে সেখানে অমিতকে বলতে শোনা যায়-
"আমাদের অভ্যস্ততা হচ্ছে ঘড়ায় তোলা জল। সেটাকে নিয়ম করে রোজ ব্যবহার করতে হয়, তাতে বিস্ময় নেই, আনন্দ আছে কিন্তু উত্তেজনার তীব্রতা নেই।"
অর্থাৎ, প্রথাগত বিয়ের সম্পর্ক মানেই হলো স্থিরতা বা স্থবিরতা, যেখানে প্রেম সময়ের সাথে সাথে নিজের তীক্ষ্ণতা হারিয়ে ফেলে।
২.'ঝরনার জল'-যা মুক্ত ও সৃজনশীল প্রেম হিসেবে গণ্য।লাবণ্যের সঙ্গে অমিতের সম্পর্কটি হলো ‘ঝরনার জল’-এর মতো। পাহাড়ের ঝরনা যেমন পাথর ডিঙিয়ে, বাঁক নিয়ে, আপন ছন্দে বয়ে চলে এবং কোথাও আটকে থাকে না, তেমনি অমিত ও লাবণ্যের প্রেম ছিল সামাজিক বাধার ঊর্ধ্বে এক মুক্ত বৌদ্ধিক আদান-প্রদান। তাদের ভালোবাসা ছিল ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তীব্র ও সতেজ। এখানেও অমিতকে বলতে শুনি-
"আমার প্রেম যা তা ঝরনার জল-সে কেবল ঝরিয়ে দেয়, সে জমে থাকে না।"
অর্থাৎ, যে প্রেম মানুষের মনের ভেতর সবসময় নতুনত্ব নিয়ে আসে, যা কোনো পাত্রে বা সামাজিক নিয়মে বন্দি হতে চায় না-সেটাই হলো আসল প্রেম।
•৩.উপন্যাসে বিচ্ছেদের দার্শনিকতার কারণেই তাদের আর বিয়ে করা হলো না। আর এখানেই আছে রবীন্দ্রনাথের প্রেমের দর্শনের আসল চমক। আর সেই কারণেই অমিত এবং লাবণ্য দুজনেই বুঝতে পেরেছিল যে, বিয়ে করলে তাদের এই 'ঝরনার জল'-এর মতো সতেজ প্রেম সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে একসময় 'ঘড়ায় তোলা জল'-এ পরিণত হবে। অর্থাৎ, তাদের প্রেম আর কোনোদিন সেই শিলং পাহাড়ের রোমান্টিকতায় ফিরে আসবে না।তাই লাবণ্য অমিতকে বলেছিল-
"তোমাকে আমি মুক্তি দিচ্ছি।"এই বিচ্ছেদ তাদের কাছে পরাজয় নয়, বরং প্রেমকে চিরস্থায়ী করার একটি উপায়। তারা চেয়েছিল তাদের প্রেমের স্মৃতি যেন কোনো মলিনতা স্পর্শ না করে।
পরিশেষে আমাদের বলতেই হয় যে,'শেষের কবিতা' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, প্রেম সবসময় প্রাপ্তিতে শেষ হয় না। বরং যে প্রেম মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়, যা বুদ্ধি ও মনের এক গভীর সংযোগ তৈরি করে-তা বিয়ের বা সংসারের গণ্ডি ছাড়াই অমর হয়ে থাকতে পারে।আসলে-
ঘড়ায় তোলা জল =স্থবিরতা, অভ্যাস, দাম্পত্য, নিরাপত্তা।ঝরনার জল = গতিশীলতা, নতুনত্ব, বৌদ্ধিক প্রেম, স্বাধীনতা।আর-বিচ্ছেদ = প্রেমকে চিরন্তন করে রাখার একটি উপায়।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.
Comments
Post a Comment