Skip to main content

 উপেক্ষিতা প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথের মতে উপেক্ষিতা কারা? কেন এদের উপেক্ষিত বলেছেন? আলোচনা কর পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।




নিচে উদ্ধৃতিসহ পূর্ণাঙ্গ নোটটি দেওয়া হলো। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের মূল সুর ও উদ্ধৃতির সমন্বয়ে এটি ষষ্ঠ সেমিস্টারের পরীক্ষার জন্য একটি আদর্শ ও তথ্যবহুল উত্তর হিসেবে তৈরি করা হয়েছে:

### উপেক্ষিতা: রবীন্দ্রনাথের সমাজচেতনা ও নারীর অবস্থান

**ভূমিকা:**

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের নিভৃতচারী ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মানবিক সহমর্মিতা। 'উপেক্ষিতা' প্রবন্ধে কবি সমাজব্যবস্থায় প্রান্তিক অবস্থানে থাকা সেই নারীসমাজকে চিহ্নিত করেছেন, যারা দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক আভিজাত্য ও ইতিহাসচর্চার বৃত্ত থেকে বিচ্যুত। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে এই নারীরাই কেবল উপেক্ষিতা নয়, বরং তারা সমাজরূপী অট্টালিকার নিভৃত ভিত্তিপ্রস্তর।

**উপেক্ষিতা কারা?**

রবীন্দ্রনাথের মতে, 'উপেক্ষিতা' বলতে কেবল কোনো একক নারী নয়, বরং গ্রামবাংলার সেই অগণিত নারীসমাজকে বোঝানো হয়েছে, যারা সংসারের অন্দরমহলে আবদ্ধ। উচ্চবিত্ত বা তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে অবস্থানকারী এই নারীরাই প্রকৃত অর্থে সমাজের মেরুদণ্ড। কবি আক্ষেপ করে বলেছেন—

> *"ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম লেখা থাকে না, কারণ তারা কোনো রাজকীয় বা বিশাল কোনো কীর্তির দাবিদার নয়।"*

> এই শ্রমজীবী ও সেবাপরায়ণ নারীরা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে জীবনের জটিলতা ও নির্যাস বহন করে, অথচ তাদের নীরব আত্মত্যাগ স্বীকৃতিহীন থেকে যায়।

**কেন এদের উপেক্ষিত বলা হয়েছে?**

রবীন্দ্রনাথ এই নারীদের 'উপেক্ষিতা' আখ্যা দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ দর্শিয়েছেন:

১. **ইতিহাসের পুরুষতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা:** আমাদের প্রচলিত ইতিহাস মূলত রাজা-মহারাজা ও যুদ্ধের আখ্যান। সেখানে সাধারণ মানুষের, বিশেষত নারীদের অবদান উপেক্ষিত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—

> *"আমাদের ইতিহাস কেবল জয়-পরাজয়ের কথা বলে, কিন্তু সেই জয়ের নেপথ্যে যে অশ্রু ও ঘাম ঝরেছে, তার কোনো হিসাব সেখানে নেই।"*

২. **সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা:** পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর পরিচয় সবসময় পুরুষের অনুষঙ্গ হিসেবেই নির্ধারিত। তাদের কর্মময় জীবনকে সমাজ ‘স্বাভাবিক’ দায়বদ্ধতা মনে করে এর কোনো বিশেষ মূল্যায়ন করেনি। সমাজ তাদের প্রতি বিমুখ।

৩. **অদৃশ্য শ্রমের অবমূল্যায়ন:** সংসারের প্রতিটি কাজে যে শ্রম ও মেধা ব্যয়িত হয়, তার কোনো আর্থিক বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। কবি দেখিয়েছেন, তারা যে নিরলস সেবা প্রদান করে, তা সমাজ বিনামূল্যে ভোগ করে। কবি যথার্থই বলেছেন—

> *"যারা আমাদের সেবা করে তাদের প্রতি আমরা এতটাই অভ্যস্ত যে, তাদের অনুপস্থিতি ছাড়া তাদের অস্তিত্ব আমরা অনুভবই করি না।"*

৪. **প্রতিবাদহীনতার ট্র্যাজেডি:** এই নারীদের অসীম সহনশীলতা তাদের বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অভিযোগ করে না, অধিকারের দাবি জানায় না। তাদের এই নীরবতা ও নিস্পৃহতাকে সমাজ দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করে, যার ফলে তাদের প্রতি অবহেলার মাত্রা আরও ত্বরান্বিত হয়।

**কবির সমাজচিন্তা ও উত্তরণের পথ:**

রবীন্দ্রনাথ কেবল করুণা প্রকাশ করেননি, বরং প্রগতিশীল সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, এই উপেক্ষিতা নারীরাই প্রকৃত মেরুদণ্ড। তিনি মনে করেন, যে সমাজে এই নারীদের স্বীকৃতি নেই, সে সমাজ প্রকৃত সভ্যতার পথে অগ্রসর হতে পারে না। উপেক্ষিতা নারীদের প্রতি সমাজের এই উদাসীনতা দূর করা এবং তাদের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করাই প্রবন্ধটির মূল লক্ষ্য।

**উপসংহার:**

পরিশেষে বলা যায়, ‘উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নারীচরিত্রের এমন এক দিক উন্মোচন করেছেন যা চিরন্তন। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের মহিমা প্রচার করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, যাদের আমরা উপেক্ষা করে এসেছি, তারাই জীবনের প্রকৃত ধারক ও বাহক। প্রবন্ধটি কেবল একটি নারীবিষয়ক আলোচনা নয়, বরং মানবতাবাদী কবির এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যা যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নারীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টি পরিবর্তনের দাবি রাখে।

**শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ টিপস:** পরীক্ষার খাতায় উদ্ধৃতিগুলো **ইনভার্টেড কমা (" ")** দিয়ে আলাদা কালির কলমে লিখলে উত্তরের মান ও আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে। এটি শিক্ষককে বুঝিয়ে দেবে যে আপনি প্রবন্ধটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...