Skip to main content

কুমারসম্ভব এবং শকুন্তলায় "কবি দেখাইয়াছেন মোহে যাহা অকৃতার্থ মঙ্গলে তা পরিষমাপ্তি",- মহাকবি কালিদাসের এই বোধ আদর্শকে একত্র সংহত করেছেন প্রাচীন সাহিত্যে এর রবীন্দ্রনাথ। আলোচনা করো।

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর ৫০০ শব্দের মধ্যে উক্ত নোটটি উদ্ধৃতিসহ ছাত্রছাত্রীদের জন্য দিলে খুবই ভালো হয়।




 ### কালিদাসের সাহিত্যে মোহের পরিণতি ও রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্যে মহাকবি কালিদাসের কাব্যের গভীরে প্রবেশ করে যে চিরন্তন সত্যটি উদ্ঘাটন করেছেন, তা হলো কালিদাসের সৃজনশীলতার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কালিদাসের কাব্যজগতে মোহ বা আসক্তি কোনো চরম পরিণতির দিকে ধাবিত হয় না, বরং তা ত্যাগের মধ্য দিয়ে মঙ্গলে রূপান্তরিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এই বিষয়টিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন— **"কবি দেখাইয়াছেন মোহে যাহা অকৃতার্থ, মঙ্গলে তাহা পরিসমাপ্তি।"**

#### মোহের স্বরূপ ও অকৃতার্থতা

কালিদাসের অমর সৃষ্টি 'কুমারসম্ভব' এবং 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম্'—এই দুই কাব্যেই আমরা দেখি কাম বা মোহের প্রাথমিক রূপ। 'কুমারসম্ভব'-এ পার্বতীর প্রতি মহাদেবের চিত্তবিকার ঘটানোর প্রচেষ্টায় মদনের দহন এবং 'শকুন্তলম্'-এ দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রথম মিলনে যে আকস্মিকতা, তার মূলে রয়েছে মোহ। রবীন্দ্রনাথের মতে, এই মোহ বা কাম প্রাথমিক স্তরে অত্যন্ত চঞ্চল ও আত্মকেন্দ্রিক। এটি নিজের তৃপ্তি ছাড়া আর কিছু বোঝে না। তাই কালিদাসের বর্ণনায় এই মোহ বা কাম শুরুতে অকৃতার্থ। সে তার লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হয় কারণ মোহ কখনোই অসীম হতে পারে না; সে কেবল সাময়িক তৃপ্তির সন্ধানে থাকে।

#### ত্যাগের মধ্য দিয়ে মঙ্গলে রূপান্তর

কালিদাস এই মোহের চঞ্চলতাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখেননি। তিনি দেখিয়েছেন যে, কীভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মোহ তপস্যার অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে পবিত্রতায় রূপ নেয়। 'কুমারসম্ভব'-এ পার্বতীর সুদীর্ঘ কঠোর তপস্যা এবং 'শকুন্তলম্'-এ শকুন্তলার দীর্ঘ বিরহ ও দুঃখবরণ—এই দুই প্রক্রিয়াই মোহকে নির্মল করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়:

> *"কালিদাস দেখাইয়াছেন, যাহা কেবল ভোগলালসার মোহ, তাহা বিনাশ পায়; কিন্তু যাহা তপস্যার দ্বারা শুদ্ধ, তাহা শিব বা মঙ্গলের রূপ পরিগ্রহ করে।"*

পার্বতীর তপস্যা শিবকে জয় করল, আর শকুন্তলার দুঃখবরণ দুষ্মন্তের স্মৃতির অন্ধকার দূর করল। এখানেই কালিদাসের প্রতিভার সার্থকতা। তিনি কামকে বিসর্জন দেননি, বরং কামকে শুদ্ধ করে তাকে 'প্রেম' বা 'কল্যাণে' উন্নীত করেছেন। মোহের যে অকৃতার্থতা শুরুতে ছিল, তা শেষ পর্যন্ত কল্যাণের মহিমায় পূর্ণতা লাভ করেছে।

#### রবীন্দ্রনাথের বিশ্লেষণ ও সংহতি

রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের কাব্যের এই দার্শনিক দিকটিকে প্রাচীন সাহিত্যের নিরিখে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, কালিদাসের কাব্য কেবল শৃঙ্গাররসাত্মক নয়, বরং তা জীবনের গভীরতম সত্যের সন্ধান। মোহ যখন স্বার্থপর থাকে, তখন তা অকৃতার্থ; কিন্তু যখন সেই মোহ ত্যাগের আগুনে পুড়তে পুড়তে পরম মঙ্গলের দিকে ধাবিত হয়, তখন তা অমরত্ব লাভ করে। শকুন্তলা ও পার্বতী—এই দুই চরিত্রের মধ্যেই এই রূপান্তর সবচেয়ে স্পষ্ট। শকুন্তলার ক্ষেত্রে তার সেই তপোবনের সরলতা ও আশ্রমের নিয়মই তাকে অভিশাপের মধ্যেও কল্যাণের পথে রেখেছে।

#### উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য কালিদাসের মহাকাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে। মোহ যেখানে শেষ, সেখান থেকেই কল্যাণের যাত্রা শুরু—এই সত্যটি কালিদাসের শকুন্তলা ও কুমারসম্ভবকে বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। শিক্ষার্থীরা এই আলোচনার মাধ্যমে বুঝতে পারবে যে, মহাকাব্য কেবল বাহ্যিক ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং তা মানবমনের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধিকরণের এক মহাকাব্যিক দলিল। কালিদাসের লেখনীতে মোহের এই মঙ্গলে পর্যবসিত হওয়া কেবল কাব্যিক কৌশল নয়, এটিই ভারতীয় জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র।

**পরীক্ষার্থীর জন্য পরামর্শ:**

উত্তরের এই অংশগুলো অনুচ্ছেদ আকারে লিখবেন। উদ্ধৃতিগুলো ইনভার্টেড কমার মধ্যে রেখে হাইলাইট করলে পরীক্ষার খাতায় তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় দেখাবে। এটি আপনার বিশ্লেষণধর্মী বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেবে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...