প্রাচীন তথা আদিম মানুষ কীভাবে খাদ্য সাংগ্ৰহক থেকে খাদ্য উৎপাদকে পরিণত হয়েছিল, তা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ইতিহাস প্রথম সেমিস্টার মাইনর ( প্রস্তর যুগীয় সংস্কৃতি)
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, প্রাচীন ও ভারতীয় সভ্যতার উষালগ্ন থেকে আধুনিক মানুষে উত্তরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপাদান সহযোগী ভূমিকা পালন করেছিল। আর এক্ষেত্রে যে উপাদানটি এই দীর্ঘ বিবর্তনের সর্বক্ষেত্রে মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান রসদ ছিল সেটি হল খাদ্য বা খাবার। আসলে প্রাচীন মানুষ যেমন একদিনে আধুনিক মানুষে পরিণত হয়নি তেমনি প্রাচীন মানুষ একদিনে খাদ্য উৎপাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেনি।এক দীর্ঘ সময় অতিক্রান্তের মধ্যে দিয়ে মানুষ খাদ্য সংগ্রাহক থেকে আজকের খাদ্য উৎপাদকে উপনীত হয়েছে। আসলে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ভি. গর্ডন চাইল্ড এই উত্তরণকে বলেন-‘নব্য প্রস্তর বিপ্লব’।
১. শিকারি ও খাদ্যসংগ্রহকারী পর্যায়ে আদিম মানুষ মূলত প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলমূল সংগ্রহ, বন্য পশু শিকার এবং মাছ ধরার মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করত। শুধু তাই নয়, মানুষের জীবন ছিল যাযাবর শ্রেণীর। যেখানে খাদ্য খুঁজে পাওয়ার জন্য তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতে হতো, তাই তাদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান ছিল না। আর হাতিয়ার হিসেবে এই যুগে তারা পাথরের অমসৃণ, বড় এবং ভারী হাতিয়ার ব্যবহার করত।
২. রূপান্তরের কারণসমূহে আমরা দেখতে পাই- জলবায়ুর পরিবর্তন আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১০,০০০ বছর আগে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং বরফ গলতে শুরু করে। এর ফলে তৃণভূমির প্রসার ঘটে এবং নতুন নতুন গাছপালা ও শস্য জন্মায়।প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আদিম মানুষ বুঝতে পারে যে, পড়ে থাকা বীজ থেকে কীভাবে চারা গাছ জন্মায়। তারা ঋতু পরিবর্তনের সাথে শস্যের বৃদ্ধি লক্ষ্য করতে শেখে।পশুপালন হিসেবে বন্য পশুদের অনুসরণ করতে করতে তারা বুঝতে পারে যে, কিছু প্রাণীকে পোষ মানিয়ে তাদের মাংস, দুধ ও চামড়ার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব। কুকুর ছিল প্রথম পোষা প্রাণী।
৩.খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজের বৈশিষ্ট্য (নব্য প্রস্তর যুগ) দেখা যায়-খাদ্য উৎপাদন শুরু হওয়ার ফলে মানুষের সমাজে নিম্নোক্ত পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়। আর সেখানে আমরা দেখি মানুষের স্থায়ী বসতি কৃষিকাজের জন্য একই জমিতে বছরের পর বছর থাকার প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলে নদীর তীরে মানুষ স্থায়ীভাবে বাড়িঘর তৈরি করে থাকতে শুরু করে এবং গ্রামের উদ্ভব ঘটে। এরই পাশাপাশি দেখা যায়-
নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন।চাষের প্রয়োজনে তারা পাথরের ধারালো, পালিশ করা উন্নত হাতিয়ার (যেমন—কুড়াল, কাস্তে) তৈরি করে। শস্য মজুত করার জন্য তারা মাটির পাত্র বা মৃৎশিল্পের উদ্ভাবন করে। অতঃপর শুরু হয় শ্রম বিভাজন। যখন অল্প মানুষ প্রচুর খাদ্য উৎপন্ন করতে শিখল, তখন সমাজের অন্য মানুষরা অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ পেল। যেমন—কুমোর, তাঁতি বা মৃৎশিল্পী শ্রেণির উদ্ভব হলো।
উদ্বৃত্ত খাদ্য ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাদ্য উৎপন্ন হওয়ায় তা সঞ্চয় করার প্রবণতা তৈরি হয়। এই উদ্বৃত্ত খাদ্যই পরবর্তীকালে সমাজ ও সভ্যতার জটিলতর রূপ (যেমন—নগরায়ণ) গড়ে তোলার মূল শক্তি হয়ে ওঠে।
৪. নব্য প্রস্তর বিপ্লবের গুরুত্বের দিগটি অতি তাৎপর্যময়। আসলে এই রূপান্তর ছিল মানব সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর। এখানে মানুষ প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভর না করে নিজেই খাদ্য উৎপাদনের উপায় উদ্ভাবন করল। খাদ্যের নিশ্চয়তা পাওয়ায় মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেল এবং জনসংখ্যা বাড়ল।অতঃপর- ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার জন্ম হলো এবং সমাজ একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোতে প্রবেশ করল।
পরিশেষে বলা যায় যে, শিকারি ও খাদ্যসংগ্রহকারী জীবন থেকে খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজে এই রূপান্তরই ছিল মানুষের অগ্রগতির প্রথম বড় ধাপ। এটিই মানুষকে যাযাবর জীবন থেকে মুক্তি দিয়ে সভ্যতার সোপানে নিয়ে এসেছিল। আর এই প্রক্রিয়ার হাত ধরেই পরবর্তীকালে সিন্ধু সভ্যতার মতো প্রাচীন নগরকেন্দ্রিক সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠার পটভূমি তৈরি হয়।
Comments
Post a Comment