Skip to main content

যেতে নাহি দিব' কবিতায় জীবন প্রীতির সাথে বিরহ চেতনার যে দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে তার স্বরূপ বুঝিয়ে দাও।

'যেতে নাহি দিব' কবিতায় জীবন প্রীতির সাথে বিরহ চেতনার যে দ্বন্দ্ব উপস্থাপিত হয়েছে তার স্বরূপ বুঝিয়ে দাও।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনারতরী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতাটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে। এখানে একদিকে যেমন পার্থিব জীবনের প্রতি কবির গভীর অনুরাগ বা জীবনপ্রীতি প্রকাশিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সময়ের অনিবার্য প্রবাহে সেই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা বা বিরহচেতনাও মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই দুই বিপরীতধর্মী অনুভূতির টানাপোড়েনই কবিতার মূল সুর। আর সেই সুরে আমরা দেখতে পাই-

     জীবনপ্রীতির স্বরূপ।কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি, একটি শিশু তার বাবার কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইছে না। শিশুর এই আকুতি আসলে কবিরই হৃদয়ের প্রতিধ্বনি। কবি এই পৃথিবীকে, এই জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ মুহূর্তগুলোকে এতই ভালোবাসেন যে, তিনি কোনো কিছুই হারাতে চান না।কিন্তু- কবি অনুভব করেন, তাঁর চারপাশের জগৎ, মানুষের সান্নিধ্য এবং জীবনের পরিচিত রূপগুলো তাকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আর সেখানে আছে-

       স্মৃতির মূল্য। জীবন মানেই কেবল বর্তমান নয়, বরং অতীত স্মৃতির সমাহার। কবি বুঝতে পারেন, জীবনের পথ চলতে চলতে আমরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি, তা পরম মূল্যবান। তাই তিনি কোনো মুহূর্তকেই অবহেলায় ফেলে যেতে চান না। আর সেখানে উঠে এসেছে-

      বিরহচেতনার স্বরূপ।জীবনপ্রীতির সমান্তরালে কবিতার পরতে পরতে মিশে আছে এক বিষণ্ণ বিরহবোধ। কবি জানেন, কালস্রোত অমোঘ। সময় কাউকে থামিয়ে রাখে না।আসলে সময়ের দাবি মেটানোই জীবনের নিয়ম। শিশুটিকে যেমন স্কুলে যেতেই হবে, তেমনি মানুষকেও জীবনের প্রয়োজনে পরিচিত জগত, প্রিয়জন এবং বর্তমান মুহূর্ত ত্যাগ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। তবুও তার মধ্যে দেখা দেয়-

      বিচ্ছেদের বেদনা। কবি উপলব্ধি করেন যে, প্রতিটি বিদায়ই এক একটি ছোট মৃত্যু। পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই যন্ত্রণা প্রতিটি সচেতন মানুষের মনেই গভীর ক্ষত তৈরি করে। ‘যেতে নাহি দিব’ ধ্বনিটি তাই আসলে এক অসহায় আর্তনাদ-যা সময়ের স্রোতকে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা।

     জীবনপ্রীতি ও বিরহচেতনার দ্বন্দ্বে আমরা দেখতে পাই-‘স্থায়িত্বের আকাঙ্ক্ষা’ এবং ‘পরিবর্তনের অনিবার্যতার’ মধ্যে জীবন প্রীতি ও বিরহচেতনার দ্বন্দ্ব। আসলে এই কবিতায় দেখানো হয়েছে-

      প্রাণের স্পন্দন বনাম কালের গতি। আর সেখানে কবি চান প্রাণের পূর্ণতা, যা বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু ‘কাল’ বা সময় তাকে প্রতিনিয়ত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে কবি এক দোদুল্যমান অবস্থায় উপনীত হন। শুধু তাই নয়, এই কবিতায় আছে-

     আবেগ ও যুক্তির লড়াই।আবেগ বলছে ‘যেতে নাহি দিব’, কিন্তু যুক্তি ও বাস্তব বলছে ‘যেতে দিতেই হবে’। এই যে হার মেনে নেওয়ার বেদনা, তা-ই কবিতাটির ট্র্যাজিক সৌন্দর্য। এরই পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই-

        বিশ্বজনীন রূপ। শিশু ও পিতার এই কথোপকথন আসলে কবি ও বৃহত্তর পৃথিবীর সম্পর্কের প্রতীকী রূপ। কবি বুঝতে পারেন, পৃথিবী কোনোদিনই কারো জন্য স্থির হয়ে থাকে না; আমাদের যেতেই হয়, কিন্তু যাওয়ার আগে আমরা যে মুহূর্তগুলো তৈরি করি, সেগুলোই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বলা যায়, ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায় জীবনপ্রীতি ও বিরহচেতনা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। বিরহ আছে বলেই জীবনপ্রীতি এত গভীর, আর জীবনকে এত ভালোবাসি বলেই বিদায়ের বেদনা এত তীব্র। রবীন্দ্রনাথ এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, জীবন ও মৃত্যুকে, পাওয়া ও হারানোকে নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব। কালের স্রোতে সব কিছু মিলিয়ে গেলেও, সেই হারানো মুহূর্তগুলোর স্মৃতিই আমাদের অমর করে রাখে।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...