রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট হিসেবে হাজার চুরাশির মা উপন্যাসটিতে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন কীভাবে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, তা উপন্যাসের আলোকে লেখো।
হাজার চুরাশির মা- মহাশ্বেতা দেবীঃ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট হিসেবে হাজার চুরাশির মা উপন্যাসটিতে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন কীভাবে একটি উচ্চবিত্ত পরিবারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, তা উপন্যাসের আলোকে লেখো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মাইনর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে থাকি যে,মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’কেবল সুজাতা ব্রতীর ব্যক্তিগত শোকের আখ্যান নয়, এটি সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারের ভাঙন ও নৈতিক সংকট বিশ্লেষণের দলিল। উপন্যাসের পটভূমিতে নকশাল আন্দোলন কীভাবে একটি আপাত-সুখী, বিত্তশালী পরিবারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। আর এই প্রেক্ষিতে উপন্যাসটিতে আমরা দেখতে পাই-
ব্রতী সুজাতার সন্তান, যে '১০৮৪ নম্বর লাশ' হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল। ব্রতীর মৃত্যু ছিল তার উচ্চবিত্ত পরিবারের কাছে এক বিরাট ধাক্কা। ব্রতী তার পরিবারের বিলাসিতা, শ্রেণি-স্বার্থ এবং সুবিধাবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সে উপলব্ধি করেছিল যে, তার বাবার (দিব্যনাথ চ্যাটার্জি) ঐশ্বর্যের মূলে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের শোষণ। এই উপলব্ধি ব্রতীকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাকে নকশাল আন্দোলনের পথে টেনে নিয়ে যায়।আসলে-
দিব্যনাথ চ্যাটার্জির পরিবারটি ছিল সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীকে মোড়ানো একটি খোলস। এখানে ব্যক্তি-মানুষের চেয়ে সামাজিক মর্যাদা এবং প্রতিপত্তি ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রতীর আত্মাহুতি বা তার রাজনৈতিক আদর্শ পরিবারের সেই খোলসটিকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। পরিবারের সদস্যরা (বাবা ও ভাইবোন) ব্রতীর মৃত্যুকে একটি 'কলঙ্ক' হিসেবে গণ্য করে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল, যাতে তাদের সামাজিক অবস্থানে আঁচ না লাগে। অন্যদিকে, মা সুজাতা অনুভব করেন, তার ছেলে কেন সমাজব্যবস্থাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। যেখানে-
সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে নকশালবাদীরা যখন প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে ওলটপালট করতে চেয়েছিল, তখন উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো ভয় ও বিদ্বেষের প্রাচীর গড়ে তুলেছিল। উপন্যাসে দেখা যায়, ব্রতী তার পরিবারকে একটি 'বন্দিশালা' হিসেবে দেখত। অন্যদিকে, তার পরিবার ব্রতীর চিন্তাধারাকে 'বিপথগামিতা' মনে করত। এই আদর্শগত পার্থক্যের ফলে পরিবারের ভেতরেই একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত চরম বিচ্ছেদের রূপ নেয়।
ব্রতীর মৃত্যুর পর পরিবারটি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। ব্রতীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পরিবারের ভেতরে এক ধরণের ভীতি সঞ্চার করে। তারা সবসময় আতঙ্কে থাকত পাছে তাদের কোনো যোগসূত্র বা কোনো বিব্রতকর তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। সুজাতা তার নিজের অজান্তেই অনুভব করে যে, একজন মা হিসেবে সে তার সন্তানের জগত থেকে কতটা দূরে ছিল। এই অপরাধবোধ এবং পারিবারিক আভিজাত্যের অসারতা চ্যাটার্জি পরিবারের ভিতকে ভেতর থেকে নড়বড়ে করে দেয়।অতঃপর-
উপন্যাসের শেষে আমরা দেখি সুজাতা তার পরিবারের সব নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসছে। সে বুঝতে পারে, তার ছেলে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, তা কোনো ব্যক্তিগত পাগলামি ছিল না, বরং ছিল সিস্টেমের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। সুজাতার এই উপলব্ধি পরিবারের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে। চ্যাটার্জি পরিবারটি যে আভিজাত্যের অহংকারে মত্ত ছিল, তা ব্রতীর মৃত্যু ও সুজাতার রূপান্তরের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন কেবল বাইরে ঘটা কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি অণুঘটক হিসেবে কাজ করেছে যা উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যকার পচন ও নৈতিক দেউলিয়াপনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ব্রতীর আত্মত্যাগ চ্যাটার্জি পরিবারের তথাকথিত 'সুখ'-এর আবরণে ঢাকা মিথ্যেগুলোকে ধ্বংস করে দিয়ে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে তার পুরনো পরিচয় থেকে বিচ্যুত করেছে।
Comments
Post a Comment