Skip to main content

কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার মাটিতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা কেন ব্যক্ত করেছেন- তা আলোচনা করো।•

কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার মাটিতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা কেন ব্যক্ত করেছেন- তা আলোচনা করো।• কবি জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে' কবিতায় তাঁর বারবার ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা বা অমোঘ দেশপ্রেমের কথ আলোচনা করো(পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর)।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,"বাংলা কবিতার আধুনিকতার জনক জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ধ্রুপদী কবিতা হলো ‘আবার আসিব ফিরে’। এই কবিতায় কবির দেশপ্রেম কোনো কৃত্রিম আবেগ নয়, বরং বলা যেতে পারে তা তাঁর অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত এক অমোঘ টান। কবি বাংলার সাধারণ নিসর্গ, রূপ-রস ও গন্ধের সাথে নিজের সত্তাকে এমনভাবে একাত্ম করে নিয়েছেন যে, মৃত্যুর পরেও তিনি এই নশ্বর পৃথিবীতেই বারবার ফিরে আসতে চেয়েছেন। ‘আবার আসিব ফিরে’ কেবল কবির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ নয়, বরং এটি আবহমান বাংলার প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি একজন কবির অকৃত্রিম নিবেদন। আলোচ্য কবিতায় কবি কোনো বিশেষ ধর্ম বা জাতিসত্তার ঊর্ধ্বে উঠে শঙ্খচিল, শালিক, কিংবা সাধারণ গ্রাম্য কিশোরের বেশে যে ফিরে আসার বাসনা ব্যক্ত করেছেন, তা তাঁর গভীর জীবনদর্শন ও শিকড় সন্ধানী মানসকেই উন্মোচিত করে।"আর সেখানে আমরা দেখি-

        কবির এই বাংলার মাটিতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা বিশেষ তাৎপর্যবাহী।আসলে জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে' কবিতাটি কেবল একটি দেশপ্রেমমূলক কবিতা নয়, এটি কবির অস্তিত্বের সাথে বাংলার নিসর্গের এক পরম একাত্মতা। কবি কেন বারবার এই বাংলার মাটিতেই ফিরে আসতে চান, তার কারণ হলো-

      রূপসী বাংলার অমোঘ আকর্ষণ এ কবিকে বাংলায় আসার জন্য বারেবার আহ্বান জানান।আসলে জীবনানন্দ দাশের চোখে বাংলা কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি এক অনন্য রূপসী সত্তা। তিনি বিশ্বচরাচরের অন্য কোনো কিছুর বিনিময়েও বাংলাকে ছেড়ে যেতে চান না। কবি উপলব্ধি করেছেন, বাংলার নদী-মাঠ-ক্ষেত ও ধানসিঁড়ির তীরের যে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য, তা বিশ্বে অন্য কোথাও নেই। তাঁর কাছে এই প্রকৃতির রূপ এতটাই ঐশ্বর্যময় যে, মৃত্যুর পরেও তিনি এই রূপের মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেন না।শুধুমাত্র তাই নয়-

       প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে মিশে থাকার বাসনা এ কবিকে উজ্জীবিত করে রাখে। আর সেই কারণেই জীবনানন্দ দাশের ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষায় কোনো উচ্চাশা নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত বিনয়। তিনি মানুষ হিসেবে ফিরে আসার আশা যেমন করেছেন, তেমনি প্রয়োজনে শঙ্খচিল, শালিক, ভোরের কাক, হাঁস বা কিশোরের রূপ নিয়েও ফিরে আসতে চেয়েছেন। এর মূল কারণ হলো, তিনি বাংলার প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে। তাই কবি বলেন-

"আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে,

জলঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়।"

নশ্বরতা ও অবিনশ্বরতার সমন্বয় করতে চেয়েছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। কারণ কবি জানেন মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু তাঁর কাব্যিক দর্শন বলে, মৃত্যু মানেই অস্তিত্বের সমাপ্তি নয়। বাংলার প্রকৃতি যদি চিরকালীন হয়, তবে সেই প্রকৃতির প্রতিটি স্পন্দনে কবি নিজেও চিরস্থায়ী হতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করেন, শালিক বা লক্ষ্মীপেঁচার রূপে ফিরে এসে তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই থাকবেন। এই বিশ্বাস তাঁকে মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং বাংলার মাটির প্রতি তাঁর টানকে আরও দৃঢ় করেছে।

     সাধারণ জীবনের প্রতি মমতার কারণে কবি বাংলার উচ্চবিত্ত বা নাগরিক জীবনের জৌলুসের চেয়ে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ চিত্রকে বেশি ভালোবেসেছেন। কলমির গন্ধভরা জল, কুয়াশার বুকে ভেসে থাকা ধানসিঁড়ি নদী, কিংবা ভোরের কাকের ডাক—এই সাধারণ দৃশ্যগুলোই কবির কাছে স্বর্গীয়। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, বাংলার মাটি ও জল তাঁর সত্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। এই আত্মিক বন্ধনই তাঁকে বারবার ফিরে আসার প্রেরণা জোগায়।আসলে-

       সাংস্কৃতিক পরিচয় ও শিকড়ের টান জীবনানন্দ দাশের কবিসত্তার মূল ভিত্তি হলো বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি। তিনি নিজেকে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ বলে মনে করেন। তাঁর প্রতিটি ছত্রে বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি যে ঋণ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে, তা অন্য কোনো কবি বা কবিতায় এত গভীরতা পায় না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাকে ছাড়া তাঁর কবিসত্তার কোনো অর্থ নেই। তাই স্বর্গের চেয়েও তাঁর কাছে প্রিয় এই বাংলার নশ্বর মর্ত্যলোক।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,জীবনানন্দ দাশের 'আবার আসিব ফিরে' কবিতায় তাঁর ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি তাঁর জীবনদর্শন। তিনি দেখিয়েছেন যে, দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো—নিজের মাটিকে ভালোবেসে তার প্রকৃতির সাথে নিজের অস্তিত্বকে মিশিয়ে দেওয়া। শঙ্খচিল থেকে শুরু করে কিশোরের রূপ—সবই কবির সেই অসীম মমতার প্রতীক। কবির এই ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা আমাদের শেখায় যে, শিকড়ের টানে ফিরে আসাই হলো মানুষের পরম সার্থকতা।

এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং 'Shesher Kabita Sundarbon" YouTube channel Samaresh Sir 



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...