Skip to main content

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় বৈদেশিক বিববণ অথবা বিদেশী সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা করো।

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় বৈদেশিক বিববণ অথবা বিদেশী সাহিত্যের ভূমিকা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

          আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে দেশীয় উপাদানের (যেমন—সাহিত্যিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক) পাশাপাশি বৈদেশিক বিবরণ বা বিদেশী সাহিত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।যেখানে প্রাচীনকালে বহু বিদেশী পরিব্রাজক, বণিক ও দূত ভারতে এসেছিলেন। তাঁদের লেখনীতে সমকালীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির এক অনন্য চিত্র ফুটে উঠেছে। আর সেই চিত্রে আমরা দেখি-

       গ্রিক ও রোমান বিবরণ।যেটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে গ্রিক ঐতিহাসিক ও পর্যটকরা ভারতের কথা লিপিবদ্ধ করেছেন।যেখানে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস (ইতিহাসের জনক) তাঁর লেখায় ভারতের উল্লেখ করেছেন। যদিও তাঁর তথ্যগুলি কিছুটা কিংবদন্তিনির্ভর, তবুও এটি প্রাচীন ভারতের সঙ্গে পারস্যের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।শুধু তাই নয়-

       আলেকজান্ডারের অভিযানের সঙ্গে আসা নিয়ারকাস, অ্যারিস্টোবুলাস প্রমুখের বিবরণ থেকে তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। বিশেষ করে মেগাস্থিনিসের'ইন্ডিকা' গ্রন্থটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনব্যবস্থা, সমাজ ও পাটলিপুত্র নগরী সম্পর্কে জানার প্রধান উৎস।তবে-

     পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি অর্থাৎ ভারত মহাসাগর ভ্রমণ এই অজানা লেখকের গ্রন্থটি প্রথম শতাব্দীর ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যিক পথ এবং ভারতের সাথে রোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার এই বইটির গুরুত্ব চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন- 

       "বইটিকে সোনা দিয়ে ওজন করা যায়।"

       চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ হতে আমরা জানতে পারি যে,বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অনেক চীনা পরিব্রাজক ভারতে এসেছিলেন। তাঁদের বিবরণ অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ এবং কালানুক্রমিক।আর সেখানে ফাহিয়েন গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে তিনি ভারতে আসেন। তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রসার এবং তৎকালীন ভারতের শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থার কথা লিখে গেছেন।আবার ফাহিয়েনের পাশাপাশি-

          হিউয়েন সাং হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে তিনি দীর্ঘকাল ভারতে অবস্থান করেন। তাঁর 'সি-ইউ-কি' (Si-Yu-Ki) গ্রন্থে হর্ষের শাসনকাল, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, ভারতের অর্থনীতি ও সমাজজীবনের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে।এছাড়াও ই-ৎসিং সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে তিনি বৌদ্ধধর্ম ও মঠজীবনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন।

       আরব ও অন্যান্য বিবরণ অর্থাৎ মুসলমান পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের বিবরণ থেকে আমরা জানতে পারি যে,আল-বিরুনি সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণের সময় তিনি ভারতে আসেন। তাঁর রচিত 'তহকক-ই-হিন্দ' বা 'কিতাব-উল-হিন্দ' তৎকালীন ভারতের বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন এবং সামাজিক রীতিনীতির এক অসামান্য দর্পণ। একজন বিদেশী হয়েও তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন।এছাড়াও সুলেমান ও আল-মাসুদি নবম ও দশম শতকে আরব পর্যটকরা পাল ও প্রতিহার রাজাদের সমৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন।

 বৈদেশিক বিবরণের সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব

 প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিদেশী পর্যটকদের তথ্যে কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। আর সেই সীমাবদ্ধতা গুলি হলো-

     সংস্কৃতির ভিন্নতার কারনে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি লেখকরা ভারতের রীতিনীতি বুঝতে ভুল করেছেন।এছাড়াও ভাষাগত সমস্যা কারনে বা স্থানীয় ভাষা না জানায় অনেকের তথ্য শুনে শোনা বা ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে রচিত।আবার পাশাপাশি পক্ষপাতিত্ব কেউ কেউ ভারতীয়দের সম্পর্কে অতিরঞ্জিত বা অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন।

         পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,উপরে উল্লিখিত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় বৈদেশিক বিবরণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দেশীয় সাহিত্যে অনেক সময় কালপঞ্জির অভাব দেখা যায়, কিন্তু বিদেশী লেখকরা তারিখ ও সমকালীন ঘটনার সুশৃঙ্খল বিবরণ দিয়েছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের সঙ্গে এই বিদেশী সাহিত্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পূর্ণতা পেয়েছে। সুতরাং, এই বিবরণগুলি ছাড়া প্রাচীন ভারতের একটি নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস রচনা করা অসম্ভব।

এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং 'Shesher Kabita Sundarbon" YouTube channel Samaresh Sir 



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...