চার্বাক দর্শনঃ ‘চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা’- চার্বাকদের এই মতবাদের সপক্ষে যুক্তি ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
চার্বাক দর্শনঃ ‘চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা’- চার্বাকদের এই মতবাদের সপক্ষে যুক্তি ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।
ভারতীয় দর্শনে চার্বাক বা লোকায়ত মতবাদ হলো একটি বস্তুবাদী দর্শন। তাঁরা আত্মার অস্তিত্বকে স্বতন্ত্র কোনো আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে স্বীকার করে না। চার্বাকদের মতে, কোনো স্বতন্ত্র আত্মা নেই; জড়বস্তুর সংমিশ্রণে উৎপন্ন যে দেহ, তার মধ্যেই চৈতন্যের বিকাশ ঘটে। একেই বলা হয় ‘দেহাত্মবাদ’ বা ‘ভূতচৈতন্যবাদ’।
‘চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা’-সপক্ষে চার্বাকদের যুক্তি প্রদর্শনে তাঁদের এই মতবাদের সমর্থনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি প্রদান করেন। তাঁদের মতে-
• প্রত্যক্ষ প্রমাণই একমাত্র প্রমাণ।চার্বাকরা প্রত্যক্ষের বাইরে অন্য কোনো প্রমাণকে (যেমন-অনুমানে, শব্দ) স্বীকার করেন না। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা কেবল জড় দেহকেই প্রত্যক্ষ করি, কোনো অদৃশ্য আত্মাকে নয়। সুতরাং, যা প্রত্যক্ষযোগ্য নয়, তার অস্তিত্ব অস্বীকার করাই যুক্তিসঙ্গত।
•ভূতসমূহের সংমিশ্রণ। চার্বাকদের মতে, পৃথিবী, জল, অগ্নি ও বায়ু-এই চারটি মহাবৃতের সংমিশ্রণে দেহ গঠিত হয়। যেমন-তাম্র, পিত্তল বা চুন-হলুদ আলাদাভাবে নেশা উৎপাদন করতে না পারলেও তাদের মিশ্রণে যেমন নেশা তৈরি হয়, তেমনি জড় ভূতের নির্দিষ্ট বিন্যাসে শরীরে চৈতন্যের আবির্ভাব ঘটে।
•দেহের ধর্মের সঙ্গে চৈতন্যের অভিন্নতা। আমরা সাধারণ অভিজ্ঞতায় দেখি, দেহ সুস্থ থাকলে মন বা চেতনাও সুস্থ থাকে, আবার দেহ অসুস্থ হলে চেতনাও আচ্ছন্ন বা বিকৃত হয়। দেহ ধ্বংস হলে চেতনাও আর থাকে না। এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রমাণ করে যে, চেতনা দেহ থেকেই উদ্ভূত।
•ব্যবহারিক বা লৌকিক উদাহরণে আমরা বলি "আমি সুখী", "আমি মোটা", "আমি কালো"—এই উক্তিগুলোতে 'আমি' বলতে শরীরকেই বোঝানো হয়। 'আমি' বা আত্মা শরীরের অতিরিক্ত কিছু নয়। তাই দেহকেই আত্মা বলা হয়।
• দেহাত্মবাদের সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা•
চার্বাকদের এই জড়বাদী তত্ত্ব ভারতীয় দর্শনের অন্যান্য সম্প্রদায় দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছে। এর প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলি হলো:
•অনুপলব্ধি বা অভাবের অকাট্য যুক্তি। দেহ যদি আত্মার উৎস হতো, তবে মৃত দেহের মধ্যেও চেতনা থাকা উচিত ছিল, কারণ মৃত দেহেও সেই জড় উপাদানগুলি বিদ্যমান। কিন্তু মৃত্যু হলে শরীর থেকে চেতনা বিদায় নেয়। এতে প্রমাণিত হয় যে, দেহ এবং আত্মা এক নয়।
•বস্তুর ধর্মের সঙ্গে চৈতন্যের পার্থক্য। জড় বস্তু সাধারণত অচেতন হয়। জড়ের বিন্যাস বা মিশ্রণ দ্বারা কীভাবে গুণগতভাবে ভিন্ন একটি বিষয় ‘চৈতন্য’ বা ‘চেতনা’ উৎপন্ন হতে পারে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। জড়ের পরিমাণগত পরিবর্তনের ফলে গুণগত পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা চার্বাকরা দিতে পারেননি।
• স্মৃতি ও অভিন্নতার সমস্যা। মানুষের শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত দেহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সচেতনতা বা ‘আমি’-র যে নিরবচ্ছিন্ন বোধ (স্মৃতি), তা অপরিবর্তিত থাকে। দেহ পরিবর্তিত হলেও যদি আত্মা এক থাকে, তবে দেহ ও আত্মা অভিন্ন হতে পারে না।
•অনুমানের গুরুত্ব উপেক্ষা। চার্বাকরা অনুমান প্রমাণকে অস্বীকার করলেও, নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের পরোক্ষভাবে অনুমানের সাহায্য নিতে হয়। এছাড়া, জড়ের সংমিশ্রণে চেতনার জন্ম এটিও তাদের একটি অনুমান মাত্র, প্রত্যক্ষ নয়।
পরিশেষে বলা যায় যে,চার্বাকদের ‘দেহাত্মবাদ’ প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে বস্তুবাদের এক সাহসী ও জোরালো প্রকাশ। যদিও এটি আত্মা বিষয়ক বিতর্কে বহু তাত্ত্বিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে, তবুও আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) যখন মস্তিষ্ক ও মনের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে, তখন চার্বাকদের এই ‘ভূতচৈতন্যবাদ’ নতুন আঙ্গিকে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এটি দর্শনের ইতিহাসে জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
Comments
Post a Comment