প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদানের গুরুত্ব আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের পাশাপাশি সাহিত্যিক উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম।কারণ ইতিহাস কেবল শাসক বা যুদ্ধের বিবরণ নয়, বরং তৎকালীন সমাজ, ধর্ম, দর্শন এবং মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন। আর সেখানে-
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় সাহিত্যিক উপাদানের গুরুত্ব আমরা দেখতে পাই-প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে সাহিত্যিক সাহিত্যিক উৎসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আর সেই ভাগ গুলি হলো-দেশীয় সাহিত্য এবং বিদেশি বিবরণ। এই উপাদানগুলি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ এবং সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অমূল্য তথ্য প্রদান করে।
১.দেশীয় সাহিত্যিক উপাদানঃদেশীয় সাহিত্যকে আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।যার মধ্যে অন্যতম হলো ধর্মীয় সাহিত্য।আর সেই ধর্মীয় সাহিত্যের মধ্যে আছে-
•বৈদিক সাহিত্যঃ ঋগ্বেদ, সাম, যজু, অথর্ব—এই চার বেদ থেকে আর্যদের জীবনযাত্রা, ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক শ্রেণিবিভাগ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়। বৈদিক পরবর্তী যুগের ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ থেকে সে সময়ের দার্শনিক চিন্তাধারা ও রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ বোঝা যায়।
•মহাকাব্য ও পুরাণঃরামায়ণ ও মহাভারত থেকে তৎকালীন ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, রাজকীয় প্রশাসনিক ধারণা এবং সামাজিক নৈতিকতার আদর্শ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পুরাণগুলিতে রাজবংশ তালিকা (বংশানুচরিত) প্রাচীন ভারতের কালানুক্রমিক ইতিহাস নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
•বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যঃ ত্রিপিটক (বৌদ্ধ) এবং জৈন আগম গ্রন্থগুলি থেকে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান, তৎকালীন নগর জীবন, ব্যবসায়িক শ্রেণি এবং সম্রাট অশোক ও বিম্বিসারের মতো শাসকদের শাসনকালের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
ধর্মনিরপেক্ষ বা লৌকিক সাহিত্য হিসেবে আমরা পাই-
•ঐতিহাসিক জীবনীঃবাণভট্টের 'হর্ষচরিত' সম্রাট হর্ষবর্ধনের শাসনকালের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রধান উৎস। বিলহণের 'বিক্রমাঙ্কদেবচরিত' চালুক্য রাজবংশের ইতিহাস জানতে সাহায্য করে।
•অর্থশাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্রঃ কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি, গুপ্তচর ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর এক অনন্য দলিল। এটি ছাড়া মৌর্য প্রশাসন বোঝা অসম্ভব।
•নাটক ও কাব্যঃকালিদাসের 'অভিজ্ঞানশকুন্তলম' বা 'মালবিকাগ্নিমিত্র' থেকে গুপ্তযুগের সামাজিক জীবন ও রাজদরবারের চিত্র পাওয়া যায়। বিশাখদত্তের 'মুদ্রারাক্ষস' থেকে মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থানের রাজনৈতিক জটিলতা সম্পর্কে জানা যায়।
২.বিদেশি সাহিত্যিক বিবরণঃপ্রাচীন ভারতের বাইরের পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের বিবরণ ভারতীয় ইতিহাসের কালক্রম ও ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অপরিহার্য।আর সেখানে-
গ্রিক ও রোমান বিবরণঃ হেরোডোটাস, মেগাস্থিনিস এবং প্লিনির বিবরণে প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক ও সামাজিক অবস্থার তথ্য পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' মৌর্য সমাজের বর্ণব্যবস্থা, শাসনপদ্ধতি ও নগর পরিকল্পনার এক চমৎকার সমসাময়িক চিত্র তুলে ধরে।
চীনা পরিব্রাজকঃ ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং এবং ই-সিং-এর ভ্রমণবৃত্তান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হিউয়েন সাং-এর 'সি-ইউ-কি' থেকে হর্ষবর্ধনের শাসনকাল, বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ও সমসাময়িক ভারতের সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়।
আরব ও অন্যান্য বিবরণঃ আল-বেরুনির 'তহকিক-ই-হিন্দ' একাদশ শতাব্দীর ভারতের বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শন ও সমাজব্যবস্থার এক অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণমূলক চিত্র প্রদান করে।
•সাহিত্যিক উপাদানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১.সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়ঃ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে যেমন রাজাদের নাম ও যুদ্ধের কথা জানা যায়, তেমনই সাহিত্য থেকে তৎকালীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিবাহ প্রথা, জাতিভেদ এবং বিনোদনের স্বরূপ জানা যায়।
২.কালানুক্রমিক কাঠামোঃ বিভিন্ন রাজবংশের তালিকা ও বংশানুক্রমিক বিবরণের সাহায্যে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
৩.দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনঃসাহিত্যের মাধ্যমে তৎকালীন যুগের মানুষের ঈশ্বর ভাবনা, জগত ও জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এবং নীতিবোধের পরিবর্তন স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
৪.অসম্পূর্ণ তথ্য পূরণঃপ্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানে অনেক সময় প্রশাসনিক নির্দেশ বা রাজকীয় আদেশের বাইরের কোনো তথ্য থাকে না। সেই ফাঁকগুলো সাহিত্যিক উপাদানের মাধ্যমেই পূরণ করা হয়।
•সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা
ইতিহাসবিদদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, সাহিত্যিক উপাদানে অনেক সময় লেখক নিজের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা পৃষ্ঠপোষক রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত বর্ণনা দিয়ে থাকেন। যেমন, প্রশস্তি কাব্যগুলিতে রাজার গুণগান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তাই সাহিত্যিক উপাদান ব্যবহারের সময় প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের সাথে তা মিলিয়ে দেখা বা 'ক্রস-চেক' করা একান্ত আবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায় যে,সাহিত্যিক উপাদান প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে রক্ত-মাংসের মানুষে পরিণত করে। প্রত্নতত্ত্ব যদি হয় ইতিহাসের 'কঙ্কাল', তবে সাহিত্য হলো তার 'প্রাণ'। এই দুই উপাদানের সমন্বিত বিশ্লেষণই একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনার চাবিকাঠি।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.
Comments
Post a Comment