Skip to main content

যমক অলংকার কাকে বলে ? যমক অলংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করো।

যমক অলংকার কাকে বলে ? যমক অলংকারের শ্রেণীবিভাগ উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

​        যমক অলঙ্কারঃযখন একই শব্দ বা শব্দখণ্ড (শব্দগুচ্ছ) ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে কোনো কাব্যে বা বাক্যে বারবার ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে যমক অলংকার বলে। আরোও সহজ কথায় বলা যায় যে-

        যমক অলংকারে শব্দের পুনরাবৃত্তি ঘটে, কিন্তু প্রতিবার সেই শব্দের অর্থ আলাদা হয়। যদি শব্দের পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও অর্থ একই থাকে, তবে তাকে যমক অলংকার বলা যায় না, বরং তা 'পুনরুক্তি' দোষে দুষ্ট হয়।

​উদাহরণঃ "ভারতী সেজেছে আজ ভারতী সজ্জায়।"

​         ব্যাখ্যাঃ এখানে 'ভারতী' শব্দটি দুবার ব্যবহৃত হয়েছে।প্রথম 'ভারতী' শব্দের অর্থ হলো- সরস্বতী বা বিদ্যার দেবী।দ্বিতীয় 'ভারতী' শব্দের অর্থ হলো-ভারতের নিজস্ব বা ভারতীয় শৈলী।শব্দটি একই হলেও অর্থের ভিন্নতা থাকায় এটি একটি সার্থক যমক অলংকার।

•যমক অলংকারের শ্রেণী বিভাগ 

​      যমক অলংকারকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। আবৃত্ত যমক এবং অনুবৃত্ত যমক। তবে চরণে যমকের অবস্থান অনুযায়ী এই অলংকারকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। আর সেই ভাগ গুলি হলো-

​      ১) আদি যমকঃ যে অলংকারে চরণের আদিতে বা সূচনায় যমক থাকে তবে সেই অলংকারকে আদ্য বা আদি যমক অলংকার বলে।অর্থাৎ যখন শব্দের পুনরাবৃত্তি পদের শুরুতে ঘটে, তাকে আদি যমক বলে।

​উদাহরণঃ"মালা কি পরেছ গলে, মালা কি তবে হবে সই?"

​      ব্যাখ্যাঃএখানে প্রথম ‘মালা’ বলতে ফুলের হার বোঝানো হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় ‘মালা’ বলতে প্রিয়জনের নাম বা অন্য কোনো বস্তুকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

​     ২) মধ্য যমকঃ যে চরণে বা বাক্যে যখন শব্দের পুনরাবৃত্তি পদের মাঝখানে ঘটে, তাকে মধ্য যমক বলে।

উদাহরণঃ' 'পাইয়া চরণ তরি, তরি ভবে আশা।'

​        ব্যাখ্যাঃ এখানে প্রথম তরি শব্দের অর্থ হলো নৌকা। দ্বিতীয় তরি শব্দের অর্থ হলো উত্তীর্ণ।তোমার চরণ রূপ নৌকাকে অবলম্বন করে উদ্ধার (উত্তীর্ণ হব) এই আমার আশা। 

     ৩)অন্ত্য যমকঃ যে যমক অলংকার চরণের শেষে বা অন্তে অবস্থান করে সেই অলংকারকে অন্ত্যযমক অলংকার বলে। অর্থাৎ যখন শব্দের পুনরাবৃত্তি পদের শেষে ঘটে।বাংলা কাব্যে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

​উদাহরণ: " দুহিতা আনিয়া যদি না দেহ।                                                   নিশ্চয় আমি ত্যজিব দেহ।। "

    • ​ব্যাখ্যাঃ এখানে প্রথম চরণে প্রথম দেহ শব্দের অর্থ দাও এবং দ্বিতীয় চরণে দেহ শব্দের অর্থ শরীর।

​     ৪) সর্ব যমকঃ দুই বা তার বেশি চরণের আদি-মধ্য ও অন্ত্য শব্দ গুলির মধ্যে যমক হলে তাকে সর্বযমক অলংকার বলে।অর্থাৎ যখন সমগ্র পদটিই বারবার ব্যবহৃত হয় এবং প্রতিবার ভিন্ন অর্থ দেয়।

​উদাহরণ: "ভারতী সেজেছে আজ ভারতী সজ্জায়।"

​        •ব্যাখ্যা: প্রথম ‘ভারতী’ সরস্বতী বা বিদ্যার দেবী, দ্বিতীয়টি ভারত দেশের সংশ্লিষ্ট কিছু বা নির্দিষ্ট কোনো নাম।

৫)সার্থক যমক ও নিরর্থক যমকঃ

​      ক) সার্থক যমকঃ যে যমক অলংকারে পুনরাবৃত্ত শব্দ দুটির প্রত্যেকটিরই আলাদা ও নির্দিষ্ট অর্থ থাকে, তাকে সার্থক যমক বলে। এটিই যমক অলংকারের প্রকৃত বা আদর্শ রূপ।

​উদাহরণঃ"কেকাধ্বনি শুনিয়া কেকা ধায়"

​     •ব্যাখ্যা:প্রথম ‘কেকা’ শব্দের অর্থ— ময়ূরের ডাক।দ্বিতীয় ‘কেকা’ (এখানে নারীর নাম হিসেবে ব্যবহৃত) অর্থ— কোনো ব্যক্তিবিশেষ বা নারী।এখানে দুটি ‘কেকা’ শব্দেরই পৃথক ও স্পষ্ট অর্থ আছে, তাই এটি সার্থক যমক।

​     খ)নিরর্থক যমকঃ যে যমক অলংকারে পুনরাবৃত্ত শব্দের মধ্যে একটি শব্দের অর্থ থাকে, কিন্তু অন্যটির অর্থ থাকে না (অথবা অর্থহীন), তাকে নিরর্থক বা শ্রুতি যমক বলে। অনেক সময় ছন্দ মেলানোর জন্য বা কেবল শ্রুতিমাধুর্যের জন্য নিরর্থক শব্দের ব্যবহার করা হয়।

​উদাহরণ:"বকুল ফুলে বকুল হলো" (এখানে ‘বকুল’ অর্থপূর্ণ)

       •কিন্তু যদি এমন বলা হয়: "জল পড়ে পাতা নড়ে, কড়কড় করে কড়।"

​     •ব্যাখ্যাঃএখানে প্রথম ‘কড়’ (যদি অর্থহীন বা অনুনাসিক ধ্বনি হিসেবে ধরি) এবং দ্বিতীয় ‘কড়’-এর মধ্যে ধ্বনিগত মিল আছে।যদি শব্দটির অর্থ সুস্পষ্ট না হয় বা শুধুমাত্র ধ্বনিগত সাদৃশ্য বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়, তবে তাকে নিরর্থক যমক বলা হয়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir

যমক অলংকারের মূল বৈশিষ্ট্য

​১. শব্দের পুনরাবৃত্তি: একই শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দুই বা ততোধিক বার ব্যবহৃত হতে হবে।

২. অর্থের বৈচিত্র্য: এটি যমকের প্রধান শর্ত। প্রতিবার ব্যবহৃত শব্দটির অর্থ পূর্ববর্তী ব্যবহারের চেয়ে আলাদা হতে হবে।

৩. শ্রুতিমাধুর্য: যমক অলংকারের ব্যবহারে ছন্দে এক ধরনের ধ্বনি-মাধুর্য ও সংগীত তৈরি হয়, যা কবিতার শিল্পগুণ বাড়িয়ে তোলে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...