Skip to main content

রাশিয়ার চিঠি অবলম্বনে রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্র অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। প্রসঙ্গক্রমে ভারতবর্ষের কৃষি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত প্রকাশ করো।

রাশিয়ার চিঠি অবলম্বনে রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্র অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। প্রসঙ্গক্রমে ভারতবর্ষের কৃষি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত প্রকাশ করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মেজর ষষ্ঠ সেমিস্টার।

      রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা ও ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের অভিমত আলোচনায় প্রথমেই আমাদের বলে রাখা ভালো যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাশিয়ার চিঠি’ কেবল একটি ভ্রমণকাহিনি নয়, এটি এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যক্ষদর্শীর সাহসী সমাজ-বিশ্লেষণ। সোভিয়েত রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং তাকে কেন্দ্র করে ভারতের কৃষি ও কৃষক সমাজের দুরবস্থা নিয়ে কবির তুলনামূলক ভাবনা এই প্রবন্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।আর সেখানেই রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা ও রবীন্দ্র-অভিজ্ঞতা আমরা দেখতে পাই -

        সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ সেখানকার কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গণতন্ত্রীকরণ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। জারের আমলের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও শোষিত কৃষক সমাজ এবং আধুনিক সোভিয়েত রাশিয়ার কৃষি সমবায়ের মধ্যে তিনি আকাশ-পাতাল তফাত দেখেছিলেন। কবি লক্ষ্য করেছিলেন-

      সমবায় ও যৌথ উদ্যোগ। সোভিয়েত ব্যবস্থায় কৃষিকে ব্যক্তিগত মুনাফার ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত করা হয়েছে। ব্যক্তিমালিকানার বদলে সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও বণ্টনের পদ্ধতি কবির মনে এক গভীর আশার সঞ্চার করেছিল।

       শিক্ষার প্রসার। কৃষি উন্নতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তিনি দেখেছিলেন শিক্ষার বিস্তারকে। রাশিয়ার কৃষকরা কেবল চাষাবাদই শিখছিল না, তারা বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠছিল। তিনি লিখেছেন-

"রাশিয়ার কৃষিপ্রক্রিয়ার মূলে আছে বিজ্ঞান এবং কৃষকের সচেতনতা।"

       নিশ্চয়তা ও সাম্য। কৃষকের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার দায়ভার রাষ্ট্র বহন করছিল, যা গ্রামীণ জীবনে এক নতুন নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার জন্ম দিয়েছিল।

       ভারতবর্ষের কৃষিব্যবস্থা ও কবির অভিমত থেকে আমরা জানতে পারি-রাশিয়ার এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের বিপরীতে ভারতবর্ষের কৃষিব্যবস্থা কবির কাছে ছিল এক যন্ত্রণার নামান্তর। ভারতের গ্রাম ও কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। আর সেখানে আমরা দেখতে পাই যে-

        দারিদ্র্য ও অশিক্ষা। কবি অনুভব করেছিলেন যে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের কৃষকরা অজ্ঞানতা ও চরম দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। তাদের উন্নতির জন্য কোনো সামগ্রিক সরকারি উদ্যোগ বা সমবায়ী ব্যবস্থা নেই।

      শোষণের চিত্র। ভারতের কৃষক কেবল প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়, সে মহাজন, জমিদার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট। কবির মতে, ভারতবর্ষের কৃষি অসংগঠিত এবং কৃষকের কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কণ্ঠস্বর নেই। তিনি যথার্থই বলেছিলেন—

"আমাদের দেশের কৃষকদের ভাগ্য বিড়ম্বিত, কারণ তারা কেবল অভাবের সাথেই লড়াই করে না, তাদের শোষণের জন্য একটি শক্তিশালী পরজীবী শ্রেণি বিদ্যমান।"

       আধুনিকতার অভাব।কবির মতে, ভারতবর্ষের কৃষকরা আধুনিক যন্ত্রপাতি, সার বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। শিক্ষার আলো তাদের কাছে পৌঁছায়নি বলেই তারা চিরকাল পিছিয়ে রয়েছে। রাশিয়ার কৃষকদের তুলনায় ভারতের কৃষকদের তিনি ‘ভাগ্যহত’ হিসেবেই দেখেছেন।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থার সাফল্য কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ভারতের কৃষিব্যবস্থার সাথে রাশিয়ার এই ব্যবস্থার তুলনা করে তিনি আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাকেই তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ভারতের গ্রামগুলোতে শিক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক সমবায় এবং মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ ভারতবর্ষের মুক্তি অসম্ভব। ‘রাশিয়ার চিঠি’র এই কৃষিশ্চিন্তা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং ভারতীয় কৃষিসমস্যার এক অমোঘ দলিল।



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...