Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা মাইনর সিলেবাসের প্রেক্ষাপটে কবিয়াল রাম বসুর কবিগান সম্পর্কে একটি বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এটি সহায়ক হবে।

## বাংলা সাহিত্যে কবিয়াল রাম বসুর অবদান

বাংলা সাহিত্যের লোকসংস্কৃতির ধারায় 'কবিগান' একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কবিগানের যে স্বর্ণযুগ ছিল, তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী শিল্পী ছিলেন **রাম বসু** (১৭৮৬–১৮২৮)।

### ১. জীবন পরিচয়

 * **জন্ম:** ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে হাওড়া জেলার শালিখা গ্রামে।

 * **প্রাথমিক জীবন:** জোড়াসাঁকোতে পিসির বাড়িতে থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সরকারি অফিসে কেরানির কাজ করতেন।

 * **কাব্যচর্চা:** ভবানী বণিক, নীলু ঠাকুর ও ঠাকুরদাস সিংহের মতো সেকালের বিখ্যাত কবিয়ালদের জন্য তিনি গান রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। পরে তিনি নিজের দল গঠন করে তৎকালীন প্রখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রা, এন্টনি ফিরিঙ্গি ও যগা বেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদের কাশিমপুর রাজবাড়িতে কবিগান গাওয়ার সময়ই তাঁর মৃত্যু হয়।

### ২. কবিয়াল হিসেবে রাম বসুর বৈশিষ্ট্য

রাম বসুকে তাঁর শিল্পগুণ ও কাব্যপ্রতিভার কারণে কবিওয়ালাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়। তাঁর কবিগানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

 * **বিরহ-সংগীতের রাজা:** রাম বসু তাঁর বিরহ-সংগীতের জন্য সেকালে 'বিরহ-সংগীতের রাজা' নামে পরিচিত ছিলেন। প্রেম ও বিরহের আকুতি তাঁর গানে অত্যন্ত করুণ ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠত।

 * **আগমনী ও বিজয়ার গান:** রাম বসুর প্রতিভার এক উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর আগমনী ও বিজয়ার গান। তিনি মা দুর্গাকে একাধারে দেবী এবং ঘরের মেয়ে হিসেবে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা আজও অতুলনীয়।

 * **ভাষা ও ছন্দ:** তাঁর ভাষার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত মার্জিত এবং সুশৃঙ্খল। লৌকিক কবিগানের মধ্যে থেকেও তিনি ধ্রুপদী ভাব ও গভীর আবেগ মিশিয়ে গানের মান উন্নত করেছিলেন।

 * **কবির লড়াই:** প্রতিযোগিতামূলক কবিগানে (কবির লড়াই) তিনি অত্যন্ত ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতেন। সমসাময়িক কবিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গান রচনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

### ৩. কবিগানের বিষয়বস্তু

রাম বসুর গান মূলত তিনভাগে বিভক্ত:

১. **সখীসংবাদ:** রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও সখীদের কথোপকথন।

২. **বিরহ:** রাধার বিরহজনিত আর্তিকে তিনি গভীর বেদনায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

৩. **আগমনী:** উমার পিত্রালয়ে আগমন এবং বিদায়ের করুণ মুহূর্তের চিত্রায়ন।

### ৪. সাহিত্যিক মূল্যায়ন

রাম বসু কেবল একজন বিনোদনকারী কবিয়াল ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সার্থক কবি। ডঃ শিশির কুমার দাশের মতো সমালোচকরা তাঁকে শিল্পগুণে শ্রেষ্ঠ কবিয়ালদের অন্যতম বলে স্বীকার করেছেন। দুর্গাদাস লাহিড়ি সম্পাদিত 'বাঙালির গান' গ্রন্থে তাঁর ১০৩টি গান সংরক্ষিত আছে, যা থেকে তাঁর কাব্যপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।

> **সতর্কতা:** উল্লেখ্য যে, বাংলা সাহিত্যে 'রাম বসু' নামে দুজন বিখ্যাত ব্যক্তি আছেন। একজন অষ্টাদশ শতকের প্রখ্যাত **কবিয়াল রাম বসু**, অন্যজন বিংশ শতকের বিশিষ্ট প্রগতিশীল আধুনিক কবি **রাম বসু** (যিনি ‘পরান মাঝি হাঁক দিয়েছে’ কবিতার জন্য বিখ্যাত)। পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার সময় অবশ্যই কবিয়াল রাম বসুর কথা উল্লেখ করবেন।

**উপসংহার:**

পরিশেষে বলা যায়, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির ধারায় রাম বসু এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কবিগান কেবল তৎকালিক সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনই করেনি, বরং বাংলা কাব্যসাহিত্যে আবেগ ও সুরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

**সহায়ক ভিডিও:**

রাম বসুর কবিগানের শৈলী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আরও বিশদ জানতে চাইলে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন: বাংলা সাহিত্যের কবিগান

*এই ভিডিওটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও তৎকালিক সাহিত্যিক পরিমণ্ডল নিয়ে আলোচনা করে, যা রাম বসুর সমসাময়িক সময়ের প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করবে।*


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...