Skip to main content

বাংলা সাহিত্যে রাম বসুর কবিগান সম্পর্কে আলোচনা করো।

বাংলা সাহিত্যে রাম বসুর কবিগান সম্পর্কে আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস।

কবিয়াল রাম বসু: কবিগানের বিবর্তন ও শিল্পকলা•

        আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ ও ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ ছিল বাংলা কবিগানের স্বর্ণযুগ। এই ধারায় রাম বসু ছিলেন এক অনন্য প্রতিভাধর শিল্পী, যিনি কবিগানের স্থূল হাস্যরস বা অশ্লীলতাকে ত্যাগ করে তাতে এক গভীর মানবিক আবেগ ও ধ্রুপদী রস সঞ্চার করেছিলেন।আসলে-

        বাংলা সাহিত্যের লোকায়ত ধারায় ‘কবিগান’ কেবল নিছক মনোরঞ্জনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির এক প্রখর দর্পণ। এই সৃজনশীল ধারার বিবর্তনে যে কজন শিল্পী কবিত্বশক্তি, দার্শনিক গভীরতা এবং মানবিক আবেগের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, কবিয়াল রাম বসু তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিলগ্নে, যখন কবিগান প্রায়শই স্থূল হাস্যরস বা তর্কের কোলাহলে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, ঠিক সেই সময় রাম বসু তাঁর মার্জিত ভাষা, ধ্রুপদী ভাবগাম্ভীর্য এবং বিরহ-সংগীতের অসামান্য প্রয়োগের মাধ্যমে এই শিল্পমাধ্যমকে এক উচ্চতর নান্দনিক স্তরে উন্নীত করেছিলেন।তবে-

      বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন দক্ষ ‘কবিয়াল’ হিসেবেই নন, বরং ‘বিরহ-সংগীতের রাজা’ হিসেবেও স্বমহিমায় ভাস্বর। বর্তমান আলোচনায় তাঁর সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য, জীবনদর্শন এবং কবিগানের ধারায় তাঁর অনন্য অবদানের উপর আলোকপাত করা হলো।

     কবিগানের পটভূমি ও রাম বসুর অবস্থানঃ কবিগান মূলত ছিল প্রতিযোগিতামূলক গান, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার জন্য ত্বরিত বুদ্ধি এবং উপস্থিত কাব্যশক্তির প্রয়োজন হতো। রাম বসু যখন এই ধারায় আসেন, তখন কবিগানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কিন্তু সেই সময়ের অনেক কবিগানই ছিল সস্তা ও কুরুচিপূর্ণ। রাম বসু সেই ধারার পরিবর্তন ঘটিয়ে গানে 'ভক্তি' ও 'প্রেমের'সংমিশ্রণ ঘটান।আর সেখানে কাব্যশৈলী ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহে আমরা পাই-

       বিরহ-সংগীতের গভীরতা।রাম বসুকে বাংলা কবিগানের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ 'বিরহী কবি' বলা হয়। তাঁর বিরহের গানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমতত্ত্বের বাইরেও এক প্রকার মানবিক বেদনার সুর বাজত। তিনি বিরহকে কেবল তাত্ত্বিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তিগত অনুভূতির পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি-

    রামবুসুর বিরহের গানগুলোতে বিরহী রাধার হৃদয়ের যে হাহাকার ফুটে উঠত, তা শ্রোতাদের চোখের জল ফেলতে বাধ্য করত। শুধু তাই নয়-

       আগমনী ও বিজয়ার গানে রাম বসুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচয় তিনি একজন দক্ষ 'আগমনী' ও 'বিজয়া'র রচয়িতা ছিলেন। গিরিরাজ হিমালয় ও মেনকার মা হিসেবে উমার প্রতি মমতা এবং উমার বিদায়লগ্নের করুণ সুর তাঁর গানে অনন্য মাত্রা পায়। তিনি দেবীকে কেবল দেবী হিসেবে দেখেননি, বরং বাঙালির ঘরের মেয়ে হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

       ভাষা ও আলংকারিক প্রয়োগে রাম বসু ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত ভাষার শিল্পী। লোককবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কবিতায় সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের ব্যবহার ছিল চমৎকার। তিনি উপমা ও রূপকের ব্যবহারে অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ অথচ গম্ভীর।তবে-

     কবিগান প্রতিযোগিতার কৌশল (তর্ক-যুদ্ধ)ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। কবিগানের অখণ্ড বা 'লড়াই' পর্বে রাম বসু ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তাঁর তর্কের যুক্তি এবং তাৎক্ষণিক পদ রচনার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ভোলা ময়রার মতো দিগ্বিজয়ী কবিয়ালের সাথে তাঁর তর্কমূলক গানের লড়াই আজও লোকসাহিত্যের গবেষণার বিষয়।

      কবিগানের বিষয়বস্তু ও বিভাজন ধারায় রাম বসুর গানগুলো মূলত কয়েকটি ধারায় প্রবাহিত হতে দেখি। আর সেখানে আমরা পাই-

      ১)সখী সংবাদঃরাধা-কৃষ্ণের প্রেমের সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সখীদের কথোপকথন। এটি ছিল শৃঙ্গার রসের আধার।

    ২)কবির লড়াইঃ বিভিন্ন পৌরাণিক বিষয়ের অবতারণা করে প্রতিপক্ষকে যুক্তির মাধ্যমে কাবু করার প্রক্রিয়া। এখানে রাম বসু পৌরাণিক জ্ঞানের পরিচয় দিতেন।

     ৩) আগমনী ও বিজয়াঃবাঙালি গৃহজীবনের সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনীর সেতুবন্ধন। এটিই রাম বসুকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কবি করে তুলেছিল।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, রাম বসু দেখিয়েছিলেন যে, কবিগান কেবল বিনোদন নয়, এটি সাহিত্য প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের লোকায়ত ধারাটি কিছুটা মার্জিত রূপ লাভ করেছিল। শুধু তাই নয়, পৌরাণিক চরিত্রদের রক্ত-মাংসের মানুষের আবেগ দিয়ে বিচার করার প্রথাটি বাংলা সাহিত্যে কবিওয়ালাদের হাত ধরেই মজবুত হয়েছিল।রাম বসুর কোনো গান পাঠ করলে দেখা যাবে, তিনি ছোট ছোট বাক্যে বিরহের তীব্রতা বোঝাতেন। আর সেখানে আমরা দেখি-

যাও সই, আর কাজ নেই আমার কৃষ্ণ নাম লয়ে / যাঁর জন্য সর্বস্ব হারালো আমারে / সে কি জানে আমি কিসের দুঃখে মরি?”

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...