Skip to main content

শেষের কবিতাঃঅমিত রায় চরিত্রটির মধ্যে তৎকালীন রবীন্দ্রমানসের যে আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটেছে, তা আলোচনা করো।"

"অমিত রায় চরিত্রটির মধ্যে তৎকালীন রবীন্দ্রমানসের যে আধুনিকতার প্রতিফলন ঘটেছে, তা আলোচনা করো।" পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

        আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত রায় রবীন্দ্রমানসের আধুনিকতার বিচ্ছুরণ হিসেবে বিবেচিত। আর সেকারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯) বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমিত রায় কেবল এক রোমান্টিক প্রেমিক নয়, সে তৎকালীন রবীন্দ্রমানসের এক প্রখর আধুনিকতার প্রতিনিধি।আসলে-

          অক্সফোর্ড-ফেরত ব্যারিস্টার অমিত রায়ের চরিত্রটি প্রথাগত বাঙালির মানসলোক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তার আধুনিকতার স্বরূপ প্রধানত তার বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ, ফ্যাশন-সচেতনতা এবং জীবনদর্শনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে।শুধু তাই নয়-সেখানে আমরা দেখি-

      অমিতের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক আভিজাত্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য।আসলে অমিত রায় প্রথাগত আবেগসর্বস্ব বাঙালি যুবক নয়। তার আধুনিকতার মূল ভিত্তি হলো তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও রসবোধ। সে সবকিছুকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে পছন্দ করে। অক্সফোর্ডের ডিগ্রি তাকে কেবল ইংরেজি শিক্ষা দেয়নি, দিয়েছে এক ধরনের ‘আরবান আরিস্টক্রাসি’ বা নাগরিক আভিজাত্য। অমিতের আধুনিকতা তার পোশাক-আশাক এবং চলনে-বলনে প্রতিফলিত। সে মনে করে-

 "ফ্যাশানটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।"

      এই বিখ্যাত উক্তিটির মধ্য দিয়ে সে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সে জানে কীসে তাকে মানায় এবং কোন ভঙ্গিতে সে অন্যের থেকে আলাদা। তার কাছে আধুনিকতা মানে কেবল পাশ্চাত্য অনুকরণ নয়, বরং নিজের সত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করা।অতঃপর-

        প্রথা ও গণ্ডির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।অমিত রায়ের আধুনিকতার একটি বড় দিক হলো সে প্রথাগত সামাজিক নিয়মকানুনকে উপহাস করে। সে তার বন্ধুদের দলকে ‘নিষ্কর্মা’ বলে অভিহিত করে এবং তথাকথিত ‘কাজের’ ব্যস্ততাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তার কাছে জীবন মানেই কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুটে চলা নয়, বরং জীবনকে উপভোগ করা। লাবণ্যের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সে প্রথাগত প্রেমের গণ্ডি ভাঙতে চেয়েছে। সে প্রেমের স্থিতিশীলতাকে ভয় পায়, তাই সে বলে-

    "আমার প্রেম যা তা ঝরনার জল-সে কেবল ঝরিয়ে দেয়, সে জমে থাকে না।"

        প্রেমকে সাংসারিক ‘ঘড়ায় তোলা জল’-এর মতো স্থবির না করে তাকে চিরকালীন প্রবাহমানতায় ধরে রাখাই তার আধুনিক প্রেমের মূল কথা।

      মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও রবীন্দ্রমানসের প্রতিফলন দেখতে পাই অমিত চরিত্রের মধ্যে।অমিত চরিত্রটির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন আধুনিক মানুষের মানসিক দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। অমিত সবসময় নিজের বুদ্ধিকে দিয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে। আর সে কারণেই অমিত-

              ভালোবাসার সময়ও দ্বিধাগ্রস্ত, আবার সেই দ্বিধাকেও সে রোমান্টিক রূপ দিতে জানে। তার আধুনিকতা কেবল বাইরে নয়, তার অন্তরেও। সে বুঝতে পারে যে, মানুষের মন সব সময় স্থির নয়। লাবণ্যের প্রতি তার যে ভালোবাসা, তা প্রথাগত নয় বলেই তা এত গভীর। সে নিজেও স্বীকার করে-

 "প্রেমের চেয়ে প্রেমের গল্প বেশি মধুর।"

      তার এই মন্তব্যটি আধুনিক মানুষের খণ্ডবিখণ্ড অনুভূতির এক দর্পণ।

        পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,অমিত রায় চরিত্রের আধুনিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবনদর্শনেরই এক নতুন পরীক্ষা। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, আধুনিকতা হলো পুরনো সংস্কারকে যুক্তির আলোকে বিচার করা। অমিতের মধ্যে আমরা পাই এমন এক মানুষকে, যে প্রেমে পড়েও নিজের স্বকীয়তা হারাতে চায় না।আসলে-

        ‘শেষের কবিতা’য় অমিত রায়ের আধুনিকতা হলো বুদ্ধি, সৌন্দর্যবোধ এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। সে তৎকালীন রবীন্দ্রমানসের এমন এক প্রগতিশীল সত্তা, যে প্রথা ও সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের শর্তে বাঁচতে জানে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.













Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...