Skip to main content

কাব্য সংসারে এমন দুটি-একটি রমণী আছে যাহারা কবি কর্তৃক সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াও অমরলোক হইতে ভ্রষ্ট হয় নাই।" দুটি একটি রমণী কারা ? তারা কবি কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েও কিভাবে অমরলোকের স্থায়ী আসন লাভ করেছেন? আলোচনা করো । পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে কাব্য সংসারের যে দুই-একজন রমণীর কথা বলা হয়েছে, তারা হলেন সাহিত্যের পাতায় চিত্রিত এমন সব নারী চরিত্র—যাদের কবির সৃজনশীল দৃষ্টি উপেক্ষা করেছে বা যাদের প্রতি কবির সমবেদনা প্রকাশ পায়নি, অথচ যারা তাদের নিজস্ব মানবিক গুণাবলিতে পাঠকের হৃদয়ে বা অমরলোকে স্থান করে নিয়েছে। এটি রবীন্দ্রনাথের স্ব-সমালোচনামূলক এক অসাধারণ উপলব্ধি।

নিচে পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সেমিস্টারের মান অনুযায়ী ৬০০ শব্দের একটি তথ্যবহুল নোট দেওয়া হলো:

### কাব্য সংসারের উপেক্ষিতা এবং অমরলোক: রবীন্দ্রনাথের আত্ম-উপলব্ধি

**ভূমিকা:**

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবন্ধ সাহিত্যের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি সম্পর্কে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধে কবি কাব্য জগতে তাঁর নিজেরই সৃষ্ট বা অঙ্কিত এমন কিছু নারীচরিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা কবির অগোচরে বা অবহেলায় পড়ে থাকলেও কালজয়ী হয়েছে। কবির ভাষায়, *"কাব্য সংসারে এমন দুটি-একটি রমণী আছে যাহারা কবি কর্তৃক সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হইয়াও অমরলোক হইতে ভ্রষ্ট হয় নাই।"* এই উক্তিটি রবীন্দ্রমানসের গভীরতা ও তাঁর সৃষ্টির স্বয়ংক্রিয় মহিমাকে প্রকাশ করে।

**কাদের কথা বলা হয়েছে?**

রবীন্দ্রনাথ এখানে এমন কিছু নারীচরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যারা মূল উপাখ্যানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল না, বরং যাদের কবির কলম যেন এক প্রকার উপেক্ষাই করে গিয়েছিল। কিন্তু গল্পের প্রয়োজনে বা জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে তাদের যে অস্তিত্ব ফুটে উঠেছিল, তা কবির সচেতন প্রয়াসের চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল। এরা মূলত সেই সব নারী, যাদের কবি যথাযথ গুরুত্ব দিতে পারেননি বা যাদের নিয়তিকে তিনি গল্পের খাতিরে বড় করে দেখেননি। তবুও তারা তাদের অকৃত্রিম সহনশীলতা, ত্যাগ এবং মানবিক বৈশিষ্ট্যের কারণে কবির অজান্তেই কাব্যজগতে স্থায়ী আসন লাভ করেছে।

**কিভাবে তারা অমরলোকের স্থায়ী আসন লাভ করল?**

কবি কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েও এই রমণীরা অমরলোক লাভ করার পেছনে কিছু অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে:

১. **জীবনের স্বাভাবিক সত্য:** রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, কবির পরিকল্পনা বা ইচ্ছার বাইরেও সাহিত্যের চরিত্রগুলো কখনো কখনো নিজস্ব প্রাণশক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। এই রমণীদের ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে। কবি তাদের হয়তো গৌণ চরিত্র হিসেবে ভেবেছিলেন, কিন্তু তাদের জীবনের যে সত্য ও যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটেছিল, তা ছিল অত্যন্ত গভীর ও বাস্তব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—

> *"লেখকের হাত এড়াইয়া বিধাতার হাতে পড়িয়া তাহারা যেন অমর হইয়াছে।"*

২. **নিরবচ্ছিন্ন ত্যাগ ও সহনশীলতা:** কবি যাদের উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন, তাদের জীবনের ভিত্তিই ছিল অপরিসীম আত্মত্যাগ। তাদের কোনো দাবি ছিল না, কোনো উচ্চাশা ছিল না। সংসার ও সম্পর্কের খাতিরে তারা যে নীরব লাঞ্ছনা ভোগ করেছে, তা-ই তাদের পাঠকমহলে এক বিশেষ মর্যাদাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

৩. **মানবিক আবেদনের চিরন্তনতা:** এই রমণীরা কোনো অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেনি, বরং জীবনের প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তারা এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। কবি যে মানবিকতাকে উপেক্ষা করে গিয়েছিলেন, সেই মানবিকতাই কালক্রমে তাদের অমরত্ব দিয়েছে। তাদের এই অমরত্ব কবির ইচ্ছার ওপর নয়, বরং মানুষের অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল।

৪. **কবির স্ব-সমালোচনী দৃষ্টি:** এটি রবীন্দ্রনাথের মহানুভবতার পরিচয় যে, তিনি নিজের লেখার সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, তার সৃষ্টির কিছু অংশ হয়তো তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। যে রমণীদের তিনি তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন, তারাই কালক্রমে তাঁর নিজের রচনার অখণ্ডতার অন্যতম স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

**উপসংহার:**

রবীন্দ্রনাথের ‘উপেক্ষিতা’ প্রবন্ধটি শুধু নারীচরিত্রের অবহেলা নিয়ে আলোচনা নয়, বরং এটি কবির শিল্পসত্তার এক অসামান্য আত্ম-বিশ্লেষণ। যে রমণীদের তিনি অবহেলায় রেখেছিলেন, তারা আজ সাহিত্যের অমরলোকে সমাসীন। এটিই শ্রেষ্ঠ শিল্পের লক্ষণ যে, সেখানে স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি বড় হয়ে ওঠে। পরিশেষে বলা যায়, কবির এই স্বীকারোক্তি তাঁর মানবিক ও শিল্পবোধের গভীরতাকেই প্রমাণ করে, যা আজও শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্য।

**পরীক্ষার্থীর জন্য পরামর্শ:**

উত্তরের এই অংশগুলো অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাজিয়ে লিখলে পরীক্ষক প্রবন্ধের গভীর বিশ্লেষণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। উদ্ধৃতিগুলো নীল বা কালো কালিতে আলাদা করে লিখলে উত্তরের মান বাড়বে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...