Skip to main content

চার্বাক জড়বাদ কী? আলোচনা করো।

চার্বাক জড়বাদ কী? আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।

          • আমরা জানি যে,চার্বাক দর্শন হলো ভারতীয় দর্শনের একমাত্র সুসংহত জড়বাদী (Materialist) সম্প্রদায়। তাদের দর্শনকে আবার ‘লোকায়ত’ দর্শনও বলা হয়, কারণ এই দর্শন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।আর সেখানে চার্বাকদের যুক্তি হলো-

      • প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ। আসলে চার্বাকরা মনে করেন, জগতের কোনো কিছু জানার একমাত্র উপায় হলো প্রত্যক্ষ (Perception) বা সরাসরি ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা।তারা অনুমান, শব্দ (আপ্তবাক্য) বা অন্য কোনো প্রমাণকে অস্বীকার করেন।কারন হিসেবে তারা মনে করেন, যা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা ধরা পড়ে না, তা অবাস্তব।

      •জড়বাদ বা ভূতবাদ।চার্বাকদের মতে, এই জগৎ কোনো স্রষ্টা বা ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্টি হয়নি এবং এর পেছনে কোনো অদৃশ্য নিয়ম কাজ করছে না। জগৎ চারটি মৌলিক উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত-পৃথিবী(ক্ষিতি), জল(অপ), অগ্নি(তেজ) ও বায়ু(মরুৎ) (একে ‘চতুষ্পদ ভূতবাদ’ বলা হয়)।

       •দেহাত্মবাদ বা ভূতচৈতন্যবাদ।জড়বাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের আত্মা বিষয়ক মতবাদ।আর সেখানে চার্বাকদের মত হলো-

     কোনো স্বতন্ত্র আত্মা বা অমর আত্মা নেই। জড় উপাদানগুলো বিশেষ অনুপাতে মিলিত হলে শরীরে যে বিশেষ গুণের আবির্ভাব ঘটে, তাকেই ‘চৈতন্য’ বা ‘চেতনা’ বলে।

        উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন- পান, সুপারি ও চুন এগুলোর মধ্যে আলাদা কোনো লাল রঙের আভা নেই।কিন্তু এদের একটি নির্দিষ্ট মিশ্রণে চর্বন করলে তার মধ্যে এক ধরনের লাল আভা তৈরি হয়। ঠিক তেমনিভাব জড় দেহের মধ্যে চেতনার উদয় হয়।আর দেহ ধ্বংস হলে চেতনাও ধ্বংস হয়ে যায়।

   • ইহজাগতিক জীবনদর্শণ। যেহেতু পরকাল বা স্বর্গ-নরকের অস্তিত্বে তারা বিশ্বাস করেন না, তাই চার্বাকদের জীবনদর্শন হলো-“যতদিন বাঁচো, সুখে বাঁচো” (যাবজ্জীবং সুখং জীবেৎ)।আসলে তাদের মতে, লৌকিক জীবনের আনন্দই পরম পুরুষার্থ। দুঃখের আশঙ্কা থাকলেও জীবন উপভোগ করাই শ্রেয়।আর সেখানে-

    • চার্বাক দর্শনের মূল বাণী। চার্বাকদের এই জড়বাদী চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাদের একটি বিখ্যাত শ্লোকে। আর সেই শ্লোকে আমারা দেখি-

     যাবজ্জীবং সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ?

         যতদিন বেঁচে আছো, সুখে বেঁচে থাকো। প্রয়োজনে ঋণ করে হলেও ঘি (ভালো খাবার) পান করো। কারণ, দেহ একবার ভস্মীভূত (মৃত্যু) হয়ে গেলে আর তো ফিরে আসা সম্ভব নয়, তাই পরকালের চিন্তা না করে বর্তমান জীবনকে ভোগ করাটাই বাস্তব।

      মোট কথা হলো,চার্বাক জড়বাদ হলো এমন এক দর্শন যা ঈশ্বর, পরকাল, আত্মা বা কর্মফলকে অস্বীকার করে কেবল বর্তমান দৃশ্যমান জগৎ এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...