মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম স্বর্গের শোকাকুলা চিত্রাঙ্গদার যে চরিত্র কবি চিত্রিত করেছেন তা নিজের ভাষায় পরিস্ফুট করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম স্বর্গের শোকাকুলা চিত্রাঙ্গদার যে চরিত্র কবি চিত্রিত করেছেন তা নিজের ভাষায় পরিস্ফুট করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মহাকাব্যের চিরাচরিত ধারার অনুসারী হলেও, এর প্রতিটি চরিত্র কবি তাঁর নিজস্ব মনন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গড়ে তুলেছেন। কাব্যের প্রথম সর্গে প্রমীলা বা রাবণের পাশাপাশি চিত্রাঙ্গদার উপস্থিতি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও কবি সেখানে এক গভীর ও করুণ মাতৃত্বের রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে মাতা চিত্রাঙ্গদার শোকের যে ছবি কবি এঁকেছেন, তা একাধারে ট্র্যাজিক এবং মানবিক।তাই আমরা দেখি-
শোকাকুলা জননীর আর্তনাদ।প্রথম স্বর্গে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ লঙ্কাপুরীতে পৌঁছালে চারিদিকে যে হাহাকার পড়ে যায়, সেই প্রেক্ষাপটে চিত্রাঙ্গদার প্রবেশ ঘটে। বীরবাহু ছিলেন লঙ্কাবাসীর আশা-ভরসা। পুত্রের অকালমৃত্যুর সংবাদে চিত্রাঙ্গদার যে মাতৃরূপ আমরা দেখি, তা অতিশয় করুণ। তিনি কেবল একজন সাধারণ মাতা নন, বরং তিনি এক হারানো বীরের জননী, যার জীবনের সমস্ত গর্ব ও সুখ মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে গেছে।আসলে-
কবি তাঁর চরিত্রচিত্রণে দেখিয়েছেন, পুত্রের শবদেহ দেখার পর চিত্রাঙ্গদার যে প্রতিক্রিয়া, তা কোনো সাধারণ বিলাপ নয়। তিনি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলছেন-
"হা পুত্র! হা বীরবাহু! কেন বা এ বেশে/সাজিলা? এ কি সাজ, বৎস, তোর? হায় বিধি!/কি দোষে দণ্ডিলা মোরে, করিনু কি পাপ?"
এই উদ্ধৃতিটিতেই স্পষ্ট হয় যে, চিত্রাঙ্গদার শোক কেবল ব্যক্তিগত নয়, তা অমোঘ নিয়তির প্রতি এক প্রবল প্রশ্ন। পুত্র বীরবাহুর বীরত্বের সাজে সজ্জিত নিথর দেহ দেখে মাতা হিসেবে তাঁর সমস্ত রক্ষণাত্মক দেওয়াল ভেঙে পড়ে। তিনি ঈশ্বরকে বা বিধিকে দুষছেন, কারণ তিনি জানেন না কেন তাঁর নিষ্পাপ পুত্রের কপালে এমন নির্মম মৃত্যু লেখা ছিল। আর সেখানেই কবি তুলে ধরেছেন-
মাতৃত্বের মহিমা ও ট্র্যাজেডি।চিত্রাঙ্গদার চরিত্র এখানে মহাকাব্যিক সংযম হারিয়ে এক সাধারণ নারীর অসহায়তায় পর্যবসিত হয়েছে। পুত্রের মৃত্যুতে একজন জননীর যে হাহাকার, তা যেকোনো সময়ের পাঠকের মনেই গভীর সহানুভূতি জাগায়। তিনি যখন নিজের স্তনদুগ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "স্তন্য দুগ্ধ দিমু তোরে, এ কি কাল-রূপ?"—তখন তাঁর মাতৃত্বের যে চরম আর্তনাদ প্রকাশ পায়, তা পাঠকে হৃদয় বিদীর্ণ করে।
মধুসূদন তাঁর কাব্যে রাক্ষসকুলকে অসুর হিসেবে দেখাননি, বরং তাদের পারিবারিক বন্ধন, স্নেহ ও আবেগকে বড় করে তুলেছেন। চিত্রাঙ্গদার শোক সেই পারিবারিক বেদনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বীরবাহুর মা, কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি কেবলই একজন সন্তানহারা নারী। বীরবাহুর অকালমৃত্যু লঙ্কার পতনের একটি ইঙ্গিত বহন করে, আর চিত্রাঙ্গদার শোক সেই আসন্ন দুর্যোগের পূর্বাভাসকে আরও গভীর ও বেদনাদায়ক করে তোলে।
পরিশেষে বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম স্বর্গে চিত্রাঙ্গদার চরিত্রটিকে অতি অল্প পরিসরে আঁকলেও, তাঁর শোকের চিত্রে এক গভীর মহিমা আরোপ করেছেন। তিনি এমন এক জননীর রূপ এঁকেছেন যিনি পুত্রের গর্বে গর্বিত ছিলেন, কিন্তু এখন সেই পুত্রের শোকেই পাথর হয়ে গেছেন। পৌরাণিক কাঠামোর ভেতর দিয়েও কবির সৃজিত এই চিত্রাঙ্গদা চিরন্তন মানবীয় মাতৃত্বের এক সকরুণ প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর বিলাপ যেন লঙ্কাপুরী তথা সমস্ত মানবজাতির শোকেরই প্রতিধ্বনি।
*
Comments
Post a Comment