Skip to main content

মেহেরগড় সভ্যতা' সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখো।

'মেহেরগড় সভ্যতা' সম্পর্কে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।

     আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, মেহেরগড় সভ্যতা হলো ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম কৃষিভিত্তিক সভ্যতা।আসলে মেহেরগড় সভ্যতা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নব্যপ্রস্তরযুগীয় (Neolithic) বসতি।যেটি ১৯৭৪ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জঁ ফ্রাঁসোয়া জ্যারিজ (Jean-François Jarrige) এবং রিচার্ড মিডো বেলুচিস্তানের বোলান গিরিপথের কাছে এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, সিন্ধু সভ্যতার বিকাশের বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলে একটি উন্নত সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। আর সেই সভ্যতার-

       ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়কাল হিসেবে আমরা পাই মেহেরগড় সভ্যতাটি পাস্কিস্তানের বেলুচিস্তানের কচি সমভূমিতে (Kachi Plain), বোলান নদীর তীরে অবস্থিত।যেটি কার্বন ডেটিং বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেহেরগড় সভ্যতা প্রধানত খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০০ অব্দ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।তবে এটি প্রায় ৫০০০ বছরের এক দীর্ঘ ধারাবাহিক ইতিহাস।

      • মেহেরগড় সভ্যতার পর্যায়সমূহ থেকে আমরা জানতে পারি যে-প্রত্নতাত্ত্বিকরা মেহেরগড়কে মূলত ৭টি স্তরে ভাগ করেছেন, যা প্রধানত তিনটি যুগে বিভক্ত। আর সেই পর্যায়ে গুলি হলো যথাক্রমে-

    ১) প্রথম পর্যায় (৭০০০ - ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ):এটি ছিল মৃৎপাত্রহীন নব্যপ্রস্তরযুগ। মানুষ তখন পাথরের ও হাড়ের তৈরি সরঞ্জামের ব্যবহার করত। তারা কৃষিকাজ ও পশুপালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।

    ২)দ্বিতীয় পর্যায় (৫০০০ - ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ):এই সময়ে মৃৎপাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। কুঠার, তীরের ফলা প্রভৃতি তৈরির ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়।

      ৩)তৃতীয় পর্যায় (৩৫০০ - ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ):এই সময়ে সভ্যতা পরিপক্কতা লাভ করে। মৃৎপাত্রে অলঙ্করণ ও চিত্রকলার বিকাশ ঘটে এবং বসতিগুলো ক্রমশ বড় নগর সভ্যতার দিকে অগ্রসর হয়।

মেহেরগড় সভ্যতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন

    ১) কৃষি ও খাদ্যশস্যঃ মেহেরগড়বাসীরাই প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে চাষাবাদের সূচনা করে। তারা প্রধানত **গম ও যব** উৎপাদন করত। এছাড়াও খেজুর, কার্পাস বা তুলো এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল জাতীয় শস্যের চাষ করত। কৃষিকাজে তারা পাথরের তৈরি কাস্তে এবং পেষণ যন্ত্র ব্যবহার করত।

    ২) পশুপালনঃকৃষির পাশাপাশি পশুপালন ছিল তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা মূলত ভেড়া, ছাগল এবং কুঁজবিশিষ্ট ষাঁড় (Humped Bull) পালন করত। পশুর চামড়া, মাংস ও দুধ তারা খাদ্য ও উপকরণের উৎস হিসেবে ব্যবহার করত।

     ৩)বাসস্থানঃপ্রাথমিক পর্যায়ে তারা কাঁচা ইটের তৈরি চতুষ্কোণ ঘর তৈরি করত। ঘরগুলো ছিল ছোট ছোট কামরায় বিভক্ত এবং প্রতিটির সাথে শস্য মজুত করার ব্যবস্থা ছিল। এটি তাদের উন্নত জীবনব্যবস্থার পরিচয় বহন করে।

     ৪)শিল্পকলা ও কারিগরি দক্ষতার প্রথম ধাপ মৃৎশিল্প। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে সুন্দর মৃৎপাত্রের প্রচলন ঘটে। চাকার সাহায্যে তৈরি পাত্রে নানা জ্যামিতিক নকশা ও পশু-পাখির চিত্র দেখা যায়। মেহেরগড় সভ্যতার  মানুষ বিবিধ অলঙ্কার তৈরী ও ব্যবহারে দক্ষ ছিল। সে সময়কার সমাধিতে শামুক, ঝিনুক, বৈদূর্যমণি (Lapis Lazuli) ও টারকোয়েজ পাথরের পুঁতির হার পাওয়া গেছে। পাশাপাশি-মূর্তি,পোড়ামাটির তৈরি নারীমূর্তি (Female Figurines) পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত মাতৃকা পূজার ইঙ্গিত দেয়।

     ৫) ধর্মীয় বিশ্বাস ও সমাধিঃমেহেরগড়বাসীরা পরলোকে বিশ্বাস করত। মৃতদেহগুলিকে তারা তাদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, অলঙ্কার এবং কখনো কখনো গৃহপালিত পশুদের সাথে সমাধিস্থ করত। কবরে লাল রঙের প্রলেপ দেওয়ার রীতি ছিল, যা সম্ভবত কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার বা ঐতিহ্যের অংশ ছিল।

      •ঐতিহাসিক গুরুত্বঃ মেহেরগড় সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতার (হরপ্পা সভ্যতা) পূর্বসূরি হিসেবে কাজ করেছে। মেহেরগড়ের মানুষই প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজ গড়ে তুলেছিল, যা পরবর্তীকালে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। এর ভৌগোলিক অবস্থান ও জীবনযাত্রার ধারা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার ধারাবাহিক বিবর্তনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মেহেরগড় সভ্যতা কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র নয়, এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতার আদি সূতিকাগার। আদিম শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ থেকে কীভাবে মানুষ ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর সমাজ ও উন্নত নাগরিক জীবনে প্রবেশ করেছিল, মেহেরগড় তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...