শেষের কবিতা,কেতকীঃ অমিত ও লাবণ্যর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেতকী চরিত্রের ভূমিকা এবং তার সাথে অমিতের সম্পর্কের জটিলতা বিশ্লেষণ করো
কেতকীঃ অমিত ও লাবণ্যর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেতকী চরিত্রের ভূমিকা এবং তার সাথে অমিতের সম্পর্কের জটিলতা বিশ্লেষণ করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ষষ্ঠ সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে অন্যতম সেরা একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। যে উপন্যাসে অমিত, লাবণ্য ও কেতকী-এই তিনটি চরিত্র মিলে একটি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক আবর্ত তৈরি করে। কেতকী চরিত্রটি অমিত ও লাবণ্যর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল একটি বাহ্যিক বাধা নয়, বরং এটি অমিতের ব্যক্তিসত্তার দ্বান্দ্বিকতাকে প্রকট করার একটি মাধ্যম।কেতকী চরিত্র এবং অমিত-লাবণ্য-কেতকী ত্রিকোণ সম্পর্কের জটিলতা বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানে আমরা দেখি-
কেতকী হলো অমিতের অক্সফোর্ড জীবনের পরিচিতা, আধুনিক এবং কিছুটা বিলাসী এক নারী। সে লাবণ্যর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ। লাবণ্য যেখানে শান্ত ও গভীর, কেতকী সেখানে সরব, চঞ্চল ও অনেকটা অমিতেরই সমগোত্রীয়। সে জানে কীভাবে নিজের দাবি আদায় করতে হয়। অমিতের কাছে কেতকী একাধারে পরিচিত অতীত এবং অভ্যস্ত বর্তমানের প্রতিভূ।
অমিত-লাবণ্য-কেতকী সম্পর্কের জটিল সমীকরণ।যেখানে অমিত ও লাবণ্যর প্রেম যখন নতুন রূপ নিচ্ছে, ঠিক তখনই কেতকীর আবির্ভাব উপন্যাসে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। কেতকীর উপস্থিতিতে অমিতের চরিত্রের দুটি দিক ফুটে ওঠে-অতীতের স্মৃতি-
কেতকীর সাথে অমিতের সম্পর্ক এক ধরনের ‘ফ্যাশন’ ও অক্সফোর্ডীয় রীতির। অমিত কেতকীকে একটি ‘উপহার’ বা ‘অলঙ্কার’ হিসেবেই দেখত।আর- অমিতের কাছে লাবণ্য হলো এক নতুন সৃষ্টি, এক কাব্যিক উপলব্ধির মতো। আর কেতকী হলো তার সেই পুরোনো জগৎ, যা সে এড়িয়ে যেতে পারে না।অমিতের চরিত্রের এই দ্বিধা সম্পর্কে উপন্যাসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়-
"অমিতের বুদ্ধির জগতে লাবণ্য নতুন এক বিস্ময়, কিন্তু কেতকী তার অভ্যাসের এক অনিবার্য অংশ।"
সম্পর্কের জটিলতায় কেতকীর ভূমিকায় আমরা দেখি-কেতকী কেবল অমিতের প্রাক্তন প্রেমিকা নয়, সে অমিতের জীবনকে তার নিজস্ব আভিজাত্যের গণ্ডিতে বেঁধে রাখার এক অদৃশ্য সুতো। কেতকী জানে অমিতের চরিত্রের দুর্বলতা—সেটা হলো তার শব্দের কারিকুরি। সে অমিতের ‘আর্বানিটি’ বা নাগরিকতাকে উসকে দেয়। কেতকী আসার পর অমিত ও লাবণ্যর নিবিড় সম্পর্কে যে ছেদ পড়ে, তা কেবল কেতকীর জন্য নয়, বরং অমিতের নিজের দোদুল্যমান মনের জন্য।তবে এখানে-
লাবণ্য কেতকীকে দেখে বুঝতে পারে যে, অমিতের জগতের সঙ্গে তার এই জগতের দূরত্ব কতটা। কেতকীর উপস্থিতি লাবণ্যকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। কেতকী সম্পর্কে লাবণ্যর মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই লাবণ্যকে বলতে শুনি -
"তুমি যাকে ভালোবাসা বলো, তা আসলে তোমার বুদ্ধির বিলাস; কেতকী তোমার সেই বিলাসেরই পরিপূরক।"
সম্পর্কের জটিলতার আবর্তে চুড়ান্ত পরিণতিতে দেখা যায়-কেতকী চরিত্রটি অমিতের জীবনে নিয়ে আসে এক প্রকার ‘নাগরিক স্বাভাবিকতা’। লাবণ্য বুঝতে পারে যে, অমিতের চঞ্চল হৃদয়ে কেতকীর মতো এক আধুনিক, সাবলীল নারীর প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘস্থায়ী। কেতকী অমিতকে যেভাবে আঁকড়ে ধরতে চায়, লাবণ্য সেখানে অনায়াসে সরে যায়। কেতকী অমিতের ‘আর্বানিটি’কে সমর্থন করে, যেখানে লাবণ্য অমিতের ‘মানুষ’ সত্তাকে ভালোবাসত।অবশেষে -
অমিত শেষ পর্যন্ত কেতকীকে বেছে নেয় তার অভ্যাসের খাতিরে। কেতকীর জেদ এবং অমিতের আত্মসমর্পণ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তাদের পুনর্মিলন ঘটে। এখানে কেতকী অমিতের স্থিতিশীল জীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে 'শেষের কবিতা' উপন্যাসে কেতকী চরিত্রটি কোনমতেই নেতিবাচক নয়। সে অমিতের চপলতা ও আভিজাত্যের জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অমিতের জীবনের গাম্ভীর্য বা গভীরতা যে জায়গাটিতে ছিল, লাবণ্য তা স্পর্শ করেছিল ঠিকই, কিন্তু অমিতের জীবনের অভ্যস্ত পথটি ছিল কেতকীর দিকেই। কেতকীর ভূমিকা এখানে একটি ‘ক্যাটালিস্ট’ বা প্রভাবকের মতো, যা অমিতের মুখোশ খুলে তার আসল অভিরুচিকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KABITA SUNDORBON YouTube channel SAMARESH SIR.
Comments
Post a Comment