Skip to main content

মেঘনাদ বধ কাব্যের নায়ক কে? তোমার আলোচনার স্বপক্ষে যুক্তি দেখাও।

মেঘনাদ বধ কাব্যের নায়ক কে? তোমার আলোচনার স্বপক্ষে যুক্তি দেখাও।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

          আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি। এই মহাকাব্যের নায়ক কে-তা নিয়ে সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। মূলত রাবণ এবং মেঘনাদ-এই দুটি চরিত্রকে ঘিরেই নায়কত্বের দাবি আবর্তিত হয়। আমরা জানি যে, মহাকাব্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী নায়ককে হতে হয়-বীরত্বে, তেজস্বিতায়, নৈতিকতায় এবং চারিত্রিক গভীরতায় অসামান্য। মধুসূদনের এই কাব্যে রাবণ ও মেঘনাদ-উভয় চরিত্রই মহাকাব্যিক গুনে ভূষিত। নিম্নে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

       ‘মেঘনাদবধ কাব্যের’ নায়ক বিচারে একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমরা পাই-মহাকাব্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নায়ক হতে হয় এমন একজন ব্যক্তি যাঁর কেন্দ্রিকতায় কাহিনি আবর্তিত হয় এবং যাঁর ট্র্যাজিক পরিণতির মধ্য দিয়ে কাব্যের রস পরিণতি পায়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি যে-

         কাব্যের শুরু থেকে মেঘনাদের যুদ্ধপ্রস্তুতিই মূল কাহিনীকে গতি দান করে। কুম্ভকর্ণের মৃত্যুর পর মেঘনাদ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন, তখনই প্রকৃত যুদ্ধের উত্তেজনা শুরু হয়।যেখানে মধুসূদন মেঘনাদকে কেবল একজন যোদ্ধা হিসেবে দেখেননি, তাঁকে এঁকেছেন একজন সুশিক্ষিত, নীতিবান এবং কর্তব্যপরায়ণ যুবকের আদর্শরূপে। মেঘনাদের মৃত্যুতে লঙ্কার যে ধস নামে, তা কাব্যের চূড়ান্ত ট্র্যাজেডির বিন্দু।তবে-

​         সাহিত্যের প্রথা অনুযায়ী, যে চরিত্রকে ঘিরে ঘটনার বিন্যাস আবর্তিত হয়, তাঁর নামেই কাব্যের নামকরণ করা হয়। ‘মেঘনাদবধ’-এই নামকরণের মাধ্যমেই কবি পরোক্ষভাবে মেঘনাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও ট্র্যাজেডিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।তবে-

          কাব্যের নামকরণের রীতি অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধান চরিত্রের নামেই কাব্যের নামকরণ হয়। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-নামটি সরাসরি মেঘনাদের জীবনাবসানকে ইঙ্গিত করে, যা তাঁকে কাব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে বসায়।যেখানে মধুসূদন নিজেই তাঁর বন্ধু রাজনারায়ণ বসুকে চিঠিতে লিখেছিলেন-

 "I am going to celebrate the death of my favourite Indrajit." 

      অর্থাৎ কবি ব্যক্তিগতভাবে মেঘনাদের শৌর্য ও তেজস্বী চরিত্রকে অত্যন্ত পছন্দ করতেন, যা কাব্যজুড়ে মেঘনাদের বীরত্ব ও আভিজাত্যের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে।আর সেখানে  কাব্যের শুরু হয় মেঘনাদের যুদ্ধসজ্জার প্রস্তুতি ও অভিষেক দিয়ে এবং শেষ হয় তাঁর মৃত্যুর পর শোকগাথা ও অন্ত্যেষ্টির মধ্য দিয়ে। কাহিনীসূত্রে তিনিই প্রধান অবলম্বন।আবার-

         আধুনিক সমালোচকদের মতে, রাবণই এই কাব্যের প্রকৃত বা ‘ট্র্যাজিক’ নায়ক। মহাকাব্যের নায়ককে হতে হয় এমন একজন, যাঁর বিশালতা ও ত্রুটি—উভয়ই সমান প্রভাবশালী। রাবণের চরিত্রে সেই অদম্য পৌরুষ, স্নেহশীল পিতার রূপ এবং বিধিলিপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জেদ ফুটে উঠেছে।যেখানে-

          মেঘনাদ বা অন্যান্য চরিত্ররা মূলত রাবণের আজ্ঞাবাহী বা তাঁর ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। লঙ্কাপুরি ও যুদ্ধের যাবতীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু রাবণ। পুত্রশোকের করুণ আর্তনাদ ও পতনের মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি রাবণকেই ঘিরে আবর্তিত হয়।তবে-মধুসূদন নিজেই রাবণ সম্পর্কে বলেছিলেন-

"The idea of Ravan elevates and kindles my imagination. He was a grand fellow." 

     রাবণের বিশালতা ও পরাজয়ের গ্লানিই এই কাব্যকে অমরত্ব দিয়েছে।আসলে-

     পরিশেষে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে,‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কোনো সাধারণ যুদ্ধকাহিনি নয়, এটি মূলত একটি ‘ট্র্যাজেডি’। যদি প্রযুক্তিগত দিক বা নামকরণ বিচার করা হয়, তবে মেঘনাদ কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু কাব্যটির গভীর রস ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ করলে রাবণকেই কাব্যের প্রকৃত নায়ক বা ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবে গণ্য করা যুক্তিযুক্ত। রাবণ কেবল যুদ্ধের নেতা নন, তিনি লঙ্কার ধ্বংস ও নিজের পরাজয়ের সমস্ত বেদনার ভার বহনকারী-যা তাঁকে এক মহত্তম ট্র্যাজিক চরিত্রে উন্নীত করেছে।যেখানে মেঘনাদকে ‘কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু’ এবং রাবণকে ‘ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু বা ট্র্যাজিক নায়ক’ হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়েছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir 


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...