Skip to main content

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার, ইতিহাস মাইনর ইউনিট১।

      প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে মুদ্রার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকালে আধুনিক যুগের মতো কোনো ধারাবাহিক লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ ছিল না। তাই মুদ্রা বা 'মুদ্রাতত্ত্ব' (Numismatics) প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক নির্ভরযোগ্য উপাদান হিসেবে কাজ করে।আর আমরা দেখি- 

## ১. রাজনৈতিক ও বংশানুক্রমিক ইতিহাস পুনর্গঠন

মুদ্রা প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস জানতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

 * **নতুন রাজবংশের সন্ধান:** মৌর্য-পরবর্তী যুগে ব্যাকট্রিয়ার গ্রিক (ইন্দো-গ্রিক), শক ও পার্থিয়ান রাজাদের সম্পর্কে আমরা প্রায় সম্পূর্ণ তথ্যই পাই তাঁদের মুদ্রা থেকে। প্রায় ৩০ জনেরও বেশি ইন্দো-গ্রিক রাজার অস্তিত্ব কেবল মুদ্রার ওপর ভিত্তি করেই প্রমাণিত হয়েছে।

 * **রাজত্বকাল ও সীমানা নির্ধারণ:** মুদ্রায় খোদিত রাজার নাম, উপাধি এবং সন-তারিখ থেকে রাজাদের সময়কাল নিখুঁতভাবে জানা যায়। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো রাজার মুদ্রা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলে প্রমাণিত হয় যে অঞ্চলটি তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেমন—গুপ্ত যুগের মুদ্রা থেকে সমুদ্রগুপ্ত বা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।

## ২. অর্থনৈতিক অবস্থার মূল্যায়ন

একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা সংকটের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তার মুদ্রা ব্যবস্থা।

 * **সমৃদ্ধির প্রতীক:** কুশাণ ও গুপ্ত রাজাদের আমলের প্রচুর সুবর্ণ মুদ্রা (সোনার মুদ্রা) তৎকালীন ভারতের চরম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের উন্নতির কথা জানান দেয়।

 * **সংকটের ইঙ্গিত:** গুপ্ত যুগের শেষের দিকে এবং উত্তর-গুপ্ত পর্বে মুদ্রায় সোনার পরিমাণ কমে যায় এবং খাদ মেশানো শুরু হয়। এটি তৎকালীন ভারতের সামন্ততন্ত্রের উত্থান এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের পতনের দিকে ইঙ্গিত করে।

## ৩. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিফলন

মুদ্রা কেবল কেনাবেচার মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল রাজার চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির প্রচারপত্র।

 * **ধর্মীয় বিশ্বাস:** কুশাণ সম্রাট কণিষ্কের মুদ্রায় বুদ্ধ, শিব এবং গ্রিক ও পারসিক দেবদেবীর মূর্তি খোদাই করা ছিল, যা তাঁর ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়। আবার গুপ্ত মুদ্রায় লক্ষ্মী, দুর্গা ও কার্তিকেয়র চিত্র থেকে সনাতন ধর্মের পুনরুত্থানের প্রমাণ মেলে।

 * **শিল্প ও সংস্কৃতি:** গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের একটি মুদ্রায় তাঁকে 'বীণা' বাদনরত অবস্থায় দেখা যায়, যা তাঁর সংগীতানুরাগ এবং উচ্চমানের শিল্পচেতনার পরিচয় দেয়। এছাড়া মুদ্রায় ব্যবহৃত লিপি (ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী বা গ্রিক) তৎকালীন ভাষা ও লিপির বিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে।

> **একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:** ভারতের প্রাচীনতম মুদ্রা হলো 'আহত মুদ্রা' বা **Punch-marked coins** (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক)। এগুলিতে কোনো রাজার নাম বা লেখা থাকত না, কেবল পাহাড়, গাছ বা পশুর প্রতীক চিহ্ন বা খোঁচা (Punch) দেওয়া থাকত।

## ৪. বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক

রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের যে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে (যেমন—অরিকামেডু) উদ্ধার হওয়া প্রচুর পরিমাণে রোমান সোনার মুদ্রা। এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয় মশলা ও বস্ত্রের বিনিময়ে রোম থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা ভারতে আসত।

## উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সাহিত্যিক উপাদানে অনেক সময় অতিশয়োক্তি বা পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে, কিন্তু মুদ্রা যেহেতু সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় নির্দেশে তৈরি হতো, তাই এর ঐতিহাসিক সত্যতা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। সংক্ষেপে, মুদ্রা ছাড়া প্রাচীন ভারতের একটি বিশাল অংশের ইতিহাস অন্ধকারেই থেকে যেত।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...