Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা মেজর সিলেবাসের চতুর্থ সেমিস্টারের উপযোগী **প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার** নির্ঘণ্ট এবং ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নোট।

## প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা: কালসীমা ও বৈশিষ্ট্য

ভারতীয় আর্য ভাষার ইতিহাসের প্রথম স্তর হলো **প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা** (Old Indo-Aryan / OIA)। এটি মূলত বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত ভাষার সমন্বিত রূপ।

### ১. কালগত সীমা

ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার কালসীমা আনুমানিক **খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ** পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এর পরবর্তী বিকাশ হিসেবে ধ্রুপদী সংস্কৃতকেও এই পর্যায়ভুক্ত ধরা হয়, যার শেষ সীমা খ্রিস্টীয় ১ম বা ২য় শতাব্দী পর্যন্ত প্রসারিত।

### ২. নির্দেশন বা নিদর্শনসমূহ

এই ভাষার প্রধান নিদর্শনগুলি দুই ভাগে বিভক্ত:

 * **বৈদিক ভাষা:** ঋগ্বেদ (প্রাচীনতম নিদর্শন), সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ।

 * **ধ্রুপদী সংস্কৃত:** বাল্মীকি রামায়ণ, মহাভারত এবং পরবর্তীতে পাণিনি রচিত ‘অষ্টাধ্যায়ী’ ব্যাকরণ এই ভাষার বিশুদ্ধ রূপকে স্থায়িত্ব দান করে।

### ৩. ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক গঠন ছিল অত্যন্ত জটিল ও সুশৃঙ্খল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

#### ক. স্বরধ্বনির বৈশিষ্ট্য

১. **হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের প্রাচুর্য:** এতে অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, ৠ, ৯, এ, ঐ, ও, ঔ—এই স্বরধ্বনিগুলি প্রচলিত ছিল।

২. **ঋ ও ৯-এর ব্যবহার:** প্রাচীন আর্য ভাষায় 'ঋ' এবং '৯' (লৃ) স্বরধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা পরবর্তী স্তরগুলিতে পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

৩. **অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ:** স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে উচ্চারণের স্পষ্টতা ও দীর্ঘায়নের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

#### খ. ব্যঞ্জনধ্বনির বৈশিষ্ট্য

১. **বর্গীয় ব্যঞ্জনধ্বনি:** কণ্ঠ্য, তালব্য, মূর্ধন্য, দন্ত্য ও ওষ্ঠ্য—এই পাঁচ বর্গের প্রতিটি বর্গে পাঁচটি করে ধ্বনি ছিল (যেমন: ক, খ, গ, ঘ, ঙ)।

২. **মূর্ধন্য ধ্বনির ব্যাপকতা:** প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষায় মূর্ধন্য ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ড়, ঢ়) ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সুবিন্যস্ত।

৩. **উষ্ম ও অন্তঃস্থ ধ্বনি:** শ, ষ, স, হ (উষ্ম) এবং য, র, ল, ব (অন্তঃস্থ) ধ্বনিগুলির নির্ভুল উচ্চারণ এই ভাষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

#### গ. ব্যাকরণগত ধ্বনিতত্ত্ব

১. **শ্লেষ্মা বা সন্ধির ব্যবহার:** শব্দের সন্ধি প্রক্রিয়ায় ধ্বনির পরিবর্তন এবং সংহতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।

২. **স্বরসঙ্গতি:** শব্দের গঠনে স্বরের আদান-প্রদান বা পরিবর্তনের নিয়মনীতি অত্যন্ত কঠোর ছিল।

৩. **আঘাত বা 'Pitch Accent':** বৈদিক ভাষায় শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটত 'উদাত্ত', 'অনুদাত' ও 'স্বরিত'—এই তিন প্রকার স্বরাঘাতের মাধ্যমে। ধ্রুপদী সংস্কৃতের দিকে আসার সময় এই বিশেষ স্বরাঘাত লোপ পেতে থাকে।

#### ঘ. ধ্বনিগত বিবর্তন প্রবণতা

 * প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা মূলত **সংযোগমূলক (Synthetic)** ভাষা ছিল। শব্দের বিভক্তি বা ধ্বনি পরিবর্তনের মাধ্যমে কারক ও বচনের পার্থক্য নির্ণয় করা হতো।

 * এই স্তরের শেষের দিকে ধ্বনিবিন্যাসে একটি বিশেষ জটিলতা ছিল, যা পরবর্তী ‘মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষা’ (পালি, প্রাকৃত) স্তরে এসে অনেকটা সরলীকৃত হয়েছে।

**পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরামর্শ:**

উত্তরে অবশ্যই ঋগ্বেদের শ্লোকের উদাহরণ বা পাণিনির ব্যাকরণের উল্লেখ করবে। যেমন— ‘অগ্নিমিলে পুরোহিতং’ (ঋগ্বেদ) এটি প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার ধ্বনিবিন্যাসের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

আপনার ছাত্রছাত্রীরা কি এই ভাষার রূপতাত্ত্বিক (Morphological) বৈশিষ্ট্য বা বিভক্তি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত নোট চাইছেন?


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...