Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ৫ ও ১৫ নম্বরের প্রশ্নের মানদণ্ড মাথায় রেখে **'নির্দেশনা' (Guidance)** বিষয়ের এই নোটটি সম্পূর্ণ তথ্যবহুল এবং পয়েন্টভিত্তিক আলোচনা করা হলো, যা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করবে। ষষ্ঠ সেমিস্টার  এডুকেশন মাইনর 

# অধ্যায়: নির্দেশনা (Guidance)

## বিষয়: সংজ্ঞা, পরিধি এবং প্রয়োজনীয়তা

## ১. নির্দেশনার ধারণা ও সংজ্ঞা (Concept and Definition)

**সাধারণ অর্থ:** সাধারণ অর্থে 'নির্দেশনা' বা Guidance বলতে কোনো ব্যক্তিকে পথ দেখানো, পরামর্শ দেওয়া বা কোনো কাজে সাহায্য করাকে বোঝায়।

**শিক্ষাগত অর্থ:** আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে নির্দেশনা হলো এমন একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে তার নিজস্ব ক্ষমতা, আগ্রহ, ও সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে সাহায্য করা হয়, যাতে সে নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারে এবং সমাজের সাথে সঠিকভাবে সংগতিবিধান (Adjustment) করতে পারে।

> **বিখ্যাত শিক্ষাবিদদের সংজ্ঞা:**

> * **ক্রো এবং ক্রো (Crow and Crow):** "নির্দেশনা হলো কোনো যোগ্য বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক অপর কোনো ব্যক্তিকে (সাধারণত কোনো তরুণ বা শিক্ষার্থীকে) প্রদত্ত এমন এক ধরনের সহায়তা, যা তাকে নিজের জীবনধারা পরিচালনা করতে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে এবং নিজের বোঝা নিজে বহন করতে সাহায্য করে।"

> * **জে. বি. সিয়ার্স (J. B. Sears):** "নির্দেশনা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোনো ব্যক্তিকে তার জীবনের লক্ষ্য আবিষ্কার করতে এবং তা অর্জন করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে সাহায্য করে।"

## ২. নির্দেশনার পরিধি (Scope of Guidance)

নির্দেশনার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। মানব জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। নিচে নির্দেশনার প্রধান পরিধি বা ক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:

 * **শিক্ষাগত পরিধি (Educational Scope):** শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে নির্দেশনা কাজ করে। সঠিক পাঠ্যক্রম নির্বাচন, পড়াশোনার সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ, সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলীতে অংশ নেওয়া এবং পরীক্ষার ভয় দূর করার ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

 * **বৃত্তিমূলক পরিধি (Vocational Scope):** আধুনিক যুগে হাজারো জীবিকার মধ্যে নিজের যোগ্যতা, বুদ্ধি ও আগ্রহ অনুযায়ী সঠিক পেশা বা বৃত্তি নির্বাচন করা বেশ কঠিন। নির্দেশনা ব্যক্তিকে তার উপযুক্ত পেশা নির্বাচন, সেই পেশার জন্য প্রস্তুতি এবং চাকরিতে প্রবেশের পর সেখানে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

 * **ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিধি (Personal and Social Scope):** ব্যক্তির নিজস্ব আবেগগত সমস্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বা মানসিক অশান্তি দূর করতে ব্যক্তিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি, সমাজের চারপাশের মানুষের সাথে কীভাবে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয়, তা শেখানোও নির্দেশনার পরিধির অন্তর্গত।

 * **স্বাস্থ্যের পরিধি (Health Scope):** শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া, সঠিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গঠন এবং মাদকাসক্তি বা মানসিক অবসাদের মতো সমস্যা থেকে দূরে রাখার জন্য স্বাস্থ্য নির্দেশনার প্রয়োজন হয়।

 * **অবসর যাপনের পরিধি (Avocational Scope):** দৈনন্দিন কাজের পর অবসর সময়কে কীভাবে সৃজনশীল এবং উৎপাদনশীল উপায়ে ব্যবহার করা যায় (যেমন: বই পড়া, বাগান করা, খেলাধুলা), সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

## ৩. নির্দেশনার গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা (Need and Importance)

বর্তমান জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব নিচে কয়েকটি প্রধান দিক থেকে আলোচনা করা হলো:

### ক) ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রয়োজনীয়তা (Individual Needs)

 * **আত্ম-উপলব্ধি (Self-realization):** প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে কিছু সুপ্ত সম্ভাবনা থাকে। নির্দেশনা শিক্ষার্থীকে তার নিজের বুদ্ধি, আগ্রহ, ঝোঁক এবং ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

 * **সংগতিবিধান বা মানিয়ে নেওয়া (Adjustment):** নতুন পরিবেশ, বিদ্যালয়, বন্ধু বা পরিবারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অনেক শিক্ষার্থীর সমস্যা হয়। নির্দেশনা তাদের এই সংগতিবিধানে সাহায্য করে মানসিক চাপ কমায়।

 * **ব্যক্তিত্বের সুষম বিকাশ (Harmonious Development):** শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক (Emotional) বিকাশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি আদর্শ ব্যক্তিত্ব গঠনে নির্দেশনা পথ দেখায়।

### খ) শিক্ষাগত প্রয়োজনীয়তা (Educational Needs)

 * **সঠিক বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্বাচন:** মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পর কোন বিষয়টি নিয়ে পড়লে ভালো হবে, তা নির্ধারণে নির্দেশনা অত্যন্ত জরুরি।

 * **অপচয় ও অনুন্নয়ন রোধ (Wastage and Stagnation):** অনেক শিক্ষার্থী ভুল বিষয় নির্বাচন বা পড়াশোনায় মনোযোগের অভাবে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয় (অপচয়) অথবা একই ক্লাসে বারবার ফেল করে (অনুন্নয়ন)। নির্দেশনা এই সমস্যা কমিয়ে শিক্ষার মান উন্নত করে।

 * **শৃঙ্খলারক্ষা:** শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বা বিশৃঙ্খলা দূর করে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে পড়াশোনার উপযোগী রাখতে নির্দেশনা সাহায্য করে।

### c) বৃত্তিমূলক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা (Vocational and Economic Needs)

 * **উপযুক্ত পেশা নির্বাচন:** বেকারত্ব ও ভুল পেশা নির্বাচনের মানসিক যন্ত্রণা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে নির্দেশনার ভূমিকা অপরিসীম।

 * **মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার:** দেশের প্রতিটি মানুষের যোগ্যতা অনুযায়ী তাকে সঠিক কাজে নিযুক্ত করতে পারলে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়।

## উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, নির্দেশনা কোনো চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী করার একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। কোঠারি কমিশন (1964-66) নির্দেশনার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে যথার্থই উল্লেখ করেছে— *"নির্দেশনা হলো শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি কোনো বিশেষ বা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নয়।"* তাই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণে নির্দেশনার ভূমিকা অপরিহার্য।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...