Skip to main content

সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে যা জানো লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।


পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) ইতিহাস মাইনর সিলেবাস অনুযায়ী, সিন্ধু সভ্যতার (হরপ্পা সভ্যতা) নগর পরিকল্পনা হলো এই সভ্যতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অনন্য বৈশিষ্ট্য। নিচে বিস্তারিত নোটটি প্রদান করা হলো:

# সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা: প্রাচীন বিশ্বের বিস্ময়

### ভূমিকা

সিন্ধু সভ্যতা (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ - ১৯০০ অব্দ) ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম পরিকল্পিত নগর সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, লোথাল, কালিবঙ্গান প্রভৃতি নগরীর ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন মানুষ নগর পরিচালনায় অসাধারণ প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। তাদের নগর পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং জনস্বাস্থ্য বা পরিচ্ছন্নতার প্রতি সচেতনতা।

### নগর পরিকল্পনার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

#### ১. গ্রিড-পদ্ধতি (Grid System)

সিন্ধু সভ্যতার শহরগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। রাস্তাগুলো একে অপরকে সমকোণে (৯০ ডিগ্রি কোণে) ছেদ করত। এর ফলে পুরো শহরটি অনেকগুলো আয়তাকার বা বর্গাকার খণ্ডে বিভক্ত ছিল, যা আধুনিক 'গ্রিড সিস্টেম' বা দাবার বোর্ডের মতো বিন্যাসকে মনে করিয়ে দেয়।

#### ২. উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা (Drainage System)

হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের নিকাশি ব্যবস্থা।

 * **আবদ্ধ নর্দমা:** প্রতিটি বাড়ির বর্জ্য জল রাস্তার পাশে ঢাকা দেওয়া পাকা নর্দমার মাধ্যমে শহরের বাইরে চলে যেত।

 * **পরিচ্ছন্নতা:** নর্দমাগুলোর মাঝে মাঝে পরিষ্কার করার জন্য ম্যানহোল বা চেম্বার থাকত। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন নগর কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কতটা সচেতন ছিল।

#### ৩. গৃহনির্মাণশৈলী

 * **পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার:** ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো ইটের ব্যবহার ছিল বাধ্যতামূলক। ইটের অনুপাত ছিল সাধারণত ৪:২:১।

 * **স্থাপত্য:** বাড়ির দরজা-জানালা রাস্তার দিকে না খুলে ভেতরের গলির দিকে থাকত, যা শব্দ ও ধুলোবালি থেকে বাসিন্দাদের রক্ষা করত। প্রতিটি বাড়িতে উঠোন, রান্নাঘর, স্নানঘর এবং প্রয়োজনে কুয়ো থাকত।

#### ৪. দুর্গের বিভাজন (Citadel and Lower Town)

শহরগুলো সাধারণত দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত ছিল:

 * **দুর্গ বা সিটাডেল (Citadel):** এটি শহরের পশ্চিম দিকে উঁচু ঢিবির ওপর অবস্থিত ছিল। এখানে সম্ভবত শাসকশ্রেণি, পুরোহিত বা উচ্চবিত্তরা বাস করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন বা শস্যাগারগুলো এখানেই থাকত।

 * **নিম্ন শহর (Lower Town):** পূর্বদিকের নিচু এলাকাটি ছিল সাধারণ মানুষের বসবাসের স্থান, যেখানে বণিক, কারিগর ও সাধারণ নাগরিকরা থাকতেন।

#### ৫. বিশাল স্নানাগার (The Great Bath)

মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত বিশাল স্নানাগারটি তাদের স্থাপত্যবিদ্যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এটি একটি আয়তাকার জলাধার, যার চারপাশে ছিল সারিবদ্ধ ঘর। এর গায়ে বিটুমিন বা আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া ছিল যাতে জল চুঁইয়ে না যায়। এটি সম্ভবত কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হতো।

#### ৬. বিশাল শস্যাগার (Granaries)

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে বিশাল শস্যাগারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। নগরীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশস্য মজুত রাখার জন্য এই সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা তাদের সুসংগঠিত অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর পরিচয় দেয়।

#### ৭. বন্দর নগরী ও পরিকল্পিত বাণিজ্য

লোথাল ছিল এই সভ্যতার প্রধান বন্দর নগরী। এখানে একটি কৃত্রিম কৃত্রিম ডকইয়ার্ড বা জাহাজ থামার ঘাঁটি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে সেসময় জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কতটা উন্নত ছিল।

### উপসংহার

সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ছিল তৎকালীন যুগের তুলনায় বহুগুণ এগিয়ে। রাস্তাঘাট, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা প্রমাণ করে যে, এটি কোনো দৈবক্রমে গড়ে ওঠা বসতি ছিল না, বরং একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছিল। এই নগর পরিকল্পনা পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের নগর নির্মাণের ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

**পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ টিপস:**

 * উত্তরে **মহেঞ্জোদারোর স্নানাগার** এবং **লোথালের ডকইয়ার্ডের** কথা অবশ্যই উল্লেখ করবে।

 * সম্ভব হলে ইটের অনুপাত (৪:২:১) এবং গ্রিড-পদ্ধতির একটি ছোট স্কেচ বা চিত্র অঙ্কন করলে নম্বর বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই নোটটি আপনার কি আরও কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন, নাকি এটি আপনার পাঠ্যসূচির জন্য যথেষ্ট?


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...