Skip to main content

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (WBSU) পরীক্ষার মানদণ্ড অনুযায়ী, ৫ বা ১৫ নম্বরের প্রশ্নের জন্য **'নির্দেশনা কাকে বলে এবং এর বৈশিষ্ট্যসমূহ'** বিষয়ের একটি সম্পূর্ণ ও তথ্যবহুল নোট নিচে দেওয়া হলো।

# বিষয়: নির্দেশনার সংজ্ঞা ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

## ১. নির্দেশনার সংজ্ঞা (Definition of Guidance)

**সাধারণ অর্থ:** সাধারণ অর্থে 'নির্দেশনা' (Guidance) বলতে কোনো ব্যক্তিকে কোনো বিষয়ে পথ দেখানো, পরিচালনা করা বা উপযুক্ত পরামর্শ দেওয়াকে বোঝায়।

**শিক্ষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থ:** ব্যাপক অর্থে, নির্দেশনা হলো একটি পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক ও শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে (বিশেষত শিক্ষার্থীদের) এমনভাবে সাহায্য করা হয় যাতে সে তার নিজস্ব ক্ষমতা, আগ্রহ, বুদ্ধি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এর ফলে সে নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং পরিবেশের সাথে সফলভাবে সংগতিবিধান (Adjustment) করতে সক্ষম হয়।

> **কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা:**

> * **আর্থার জে. জোনস (Arthur J. Jones):** "নির্দেশনা হলো এমন এক ধরনের সাহায্য, যা একজন ব্যক্তি অপর একজন ব্যক্তিকে নিজের লক্ষ্য বা পথ নির্বাচনে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং জীবনের নানাবিধ সমস্যার সমাধানে প্রদান করে থাকে।"

> * **ম্যাথিউসন (Mathewson):** "নির্দেশনা হলো একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে তার নিজের বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত সুযোগ-সুবিধাকে বুঝতে এবং সেই অনুযায়ী নিজের জীবনের বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করা হয়।"

## ২. নির্দেশনার বৈশিষ্ট্যসমূহ (Characteristics of Guidance)

নির্দেশনার প্রকৃতি ও কার্যধারা বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করা যায়:

### ক) জীবনব্যাপী ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া (Continuous & Life-long Process)

নির্দেশনা কোনো সাময়িক বা আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত চলমান একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জীবনবিকাশের প্রতিটি স্তরেই (শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য) মানুষ নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয় এবং প্রতি পদেই তার কম-বেশি নির্দেশনার প্রয়োজন হয়।

### খ) সর্বজনীনতা (Universality)

নির্দেশনা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণী বা একদল বিশেষ মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। এটি সব শিক্ষার্থীর বা ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। বিদ্যালয়ের পিছিয়ে পড়া, সাধারণ কিংবা অতি মেধাবী—প্রতিটি শিশুরই জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে এবং সমস্যা কাটিয়ে উঠতে নির্দেশনার প্রয়োজন হয়।

### গ) ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া (Individual Centered)

নির্দেশনা সবসময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক। মনোবিজ্ঞানের নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের ক্ষমতা, বুদ্ধি, আগ্রহ এবং সামাজিক পটভূমি আলাদা (Individual Differences)। নির্দেশনা এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সম্মান জানায় এবং ব্যক্তির নিজস্ব চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আলাদাভাবে পথ দেখায়।

### ঘ) স্বনির্ভরতা অর্জন বা আত্ম-নির্দেশনা (Self-Guidance)

নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির ওপর বাইরের কোনো সিদ্ধান্ত বা মতাদর্শ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নয়। বরং ব্যক্তিকে ভেতর থেকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে সে নিজে নিজের শক্তি ও দুর্বলতা বুঝতে পারে এবং **নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে**। অর্থাৎ, ব্যক্তিকে পরনির্ভরশীল না করে স্বাবলম্বী করে তোলাই এর বৈশিষ্ট্য।

### ঙ) সামগ্রিক বিকাশের সহায়ক (Total Development of Personality)

নির্দেশনা কেবল শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারের একটি নির্দিষ্ট দিক নিয়ে কাজ করে না। এর মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, প্রাক্ষোভিক (Emotional) এবং নৈতিক—অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের সুষম ও সর্বাঙ্গীন বিকাশ ঘটানো।

### চ) সংগতিবিধানে সহায়তা (Assistance in Adjustment)

মানুষের জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। বিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশ, পরিবারের দ্বন্দ্ব, বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বা কর্মক্ষেত্রের জটিলতা—সব জায়গাতেই নির্দেশনা ব্যক্তিকে সফলভাবে সংগতিবিধান করতে বা খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

### ছ) এটি একটি সহযোগিতামূলক প্রক্রিয়া (Cooperative Venture)

নির্দেশনা কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি একটি যৌথ প্রচেষ্টা। কোনো শিক্ষার্থীকে সঠিক পথ দেখাতে গেলে নির্দেশক বা কাউন্সেলরের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষিকা, পিতামাতা এবং বন্ধু-বান্ধব—সবার সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।

### জ) তথ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক (Scientific & Data-based)

নির্দেশনা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয় না। এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক অভীক্ষা (যেমন: বুদ্ধির পরীক্ষা, আগ্রহের পরিমাপক) এবং কিউমুলেティブ রেকর্ড কার্ড (CRC)-এর মাধ্যমে ব্যক্তির সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে তবেই নির্দেশনা দেওয়া হয়।

## উপসংহার (Conclusion)

সংক্ষেপে বলা যায়, নির্দেশনা হলো শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা মানুষকে জীবনের জটিল পথে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আলো দেখায়। এটি ব্যক্তির সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে সমাজের একজন দায়িত্বশীল এবং সুসংহত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...