শব্দার্থ পরিবর্তনের যেকোনো দুটি ধারা সম্পর্কে উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের, (WBSU) চতুর্থ সেমিস্টার, বাংলা মেজর।
•শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারাঃঅর্থসংকোচ ও অর্থবিস্তার•
•ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভাষার বিবর্তনের সাথে সাথে শব্দের অর্থের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও নিরন্তর প্রক্রিয়া। একেই 'শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা' বলা হয়। সময়ের সাথে সাথে কোনো শব্দের আদি অর্থ পরিবর্তিত হয়ে নতুন অর্থ গ্রহণ করা বা অর্থের পরিধি সংকুচিত-প্রসারিত হওয়াকে শব্দার্থ পরিবর্তনের ধারা বলে।
• ভাষার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের অর্থ স্থির থাকে না। কালক্রমে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের পেছনে ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকে। শব্দার্থ পরিবর্তনের প্রধান দুটি ধারা হলো- অর্থসংকোচ এবং অর্থবিস্তার।
১. অর্থসংকোচঃ যখন কোনো শব্দ তার ব্যাপক বা সাধারণ অর্থ পরিত্যাগ করে একটি বিশেষ বা সংকীর্ণ অর্থে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তাকে অর্থসংকোচ বলা হয়। অর্থাৎ, আগে শব্দটি যে বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে ব্যবহৃত হতো, কালক্রমে তা একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে যায়।
• উদাহরণ-'মৃগ' শব্দটির আদি অর্থ ছিল যেকোনো বন্য পশু। কিন্তু বর্তমানে এই শব্দটি কেবল 'হরিণ' অর্থে ব্যবহৃত হয়। এখানে বিশাল পশুশিকারি জগত থেকে অর্থটি সংকুচিত হয়ে একটি মাত্র পশুতে সীমাবদ্ধ হয়েছে।ঠিক তেমনি-
'অন্ন' শব্দের আদি অর্থ ছিল যেকোনো ধরণের 'খাদ্য' (যেমন— 'অন্নং দেহি' বা অন্ন গ্রহণ করো)। কিন্তু বর্তমানে 'অন্ন' বলতে শুধুমাত্র 'ভাত' বোঝায়। খাদ্যের বিশাল জগত থেকে এটি নির্দিষ্ট একটি খাদ্যে সংকুচিত হয়েছে।আবার-
•'স্নাতক' প্রাচীনকালে যার স্নান সম্পন্ন হয়েছে, এমন যেকোনো ব্যক্তিকেই বোঝাত। বর্তমানে এটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বোঝায়।
২. অর্থবিস্তারঃ যখন কোনো শব্দ একটি নির্দিষ্ট বা সীমিত অর্থ অতিক্রম করে ব্যাপকতর বা সাধারণ অর্থে প্রযুক্ত হয়, তখন তাকে অর্থবিস্তার বলা হয়। অর্থাৎ, শব্দটি আগে যে গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, সময়ের বিবর্তনে তা অতিক্রম করে বৃহত্তর ক্ষেত্র জুড়ে প্রসারিত হয়।
•উদাহরণ-'কালি' শব্দটির উৎস ছিল 'কাল' (কালো) শব্দ থেকে, যা নির্দেশ করত কেবল 'কালো রঙের কালি'। কিন্তু বর্তমানে লাল, নীল বা সবুজ রঙের কালিকেও আমরা 'কালি' বলেই অভিহিত করি। রঙের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে অর্থটি বিস্তৃত হয়েছে।ঠিক তেমনি-
'তেল'শব্দের আদি অর্থ ছিল 'তিল থেকে প্রস্তুত স্নেহপদার্থ'। কিন্তু বর্তমানে তিল ছাড়াও সরষে, নারকেল, বাদাম বা পেট্রোলিয়ামজাত তরলকেও আমরা সাধারণ অর্থে 'তেল' বলি। এটি বস্তুর উৎসগত সীমা অতিক্রম করে বিস্তার লাভ করেছে।আবার-
'পাণ্ডুলিপি' বলতে আগে বোঝাত 'পাণ্ডু' বা পাণ্ডু রঙা পাতায় লেখা যা। বর্তমানে হাতে লেখা যেকোনো খসড়াকেই আমরা 'পাণ্ডুলিপি' বলি।
•শব্দার্থ পরিবর্তনের কারণ•
•ঐতিহাসিক কারণঃ সমাজের পরিবর্তনের সাথে যন্ত্র বা ব্যবহারের পরিবর্তন।
•মনস্তাত্ত্বিক কারণঃ কোনো বস্তু বা বিষয়ের প্রতি মানুষের ভালো লাগা বা মন্দ লাগার প্রভাব।
•আলঙ্কারিক প্রয়োগঃ উপমা, রূপক বা অতিশয়োক্তির ব্যবহার (যেমন— 'তুমি তো পুরো কুম্ভকর্ণ', এখানে কুম্ভকর্ণের অলসতা গুণটি ব্যক্তির ওপর আরোপিত হয়েছে)।
•সংস্কৃতির প্রভাবঃ লোকাচারের পরিবর্তনে শব্দের প্রয়োগ পরিবর্তিত হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, শব্দার্থ পরিবর্তন ভাষার একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। অর্থসংকোচ ও অর্থবিস্তার— এই দুই ধারার মাধ্যমেই বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বিবর্তিত ও পরিশীলিত হয়েছে। ভাষাবিদদের মতে, শব্দের এই অর্থান্তরই ভাষাকে প্রাণবন্ত ও গতিশীল রাখে।
এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং 'Shesher Kabita Sundarbon" YouTube channel Samaresh Sir
Comments
Post a Comment