চায়ের ধোঁয়া।। উৎপল দত্তের 'চায়ের ধোঁয়া' গ্রন্থ/প্রবন্ধের নাট্যভাবনা, প্রেক্ষাপট ও মূল বিষয়বস্তু।
চায়ের ধোঁয়া।। উৎপল দত্তের 'চায়ের ধোঁয়া' গ্রন্থ/প্রবন্ধের নাট্যভাবনা, প্রেক্ষাপট ও মূল বিষয়বস্তু। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর, সপ্তম সেমিস্টার, BNGSMC701T, (SM1).
উৎপল দত্তের নাট্যভাবনা ‘চায়ের ধোঁয়া’ আলোচনায় আমরা প্রথমেই বলে রাখি যে,বাংলা গণনাট্য আন্দোলন এবং রাজনৈতিক থিয়েটারের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত। তাঁর নাট্যচিন্তা ও প্রবন্ধ সংকলন 'চায়ের ধোঁয়া' (প্রথম প্রকাশ: ১৯৬০) থিয়েটার বিষয়ক তাঁর শাণিত পর্যবেক্ষণ ও মার্কসবাদী নাট্যবীক্ষার এক অমূল্য দলিল।আসলে-
উৎপল দত্তের নাট্যভাবনার পটভূমিতে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা, তেভাগা ও শোষিত মানুষের সংগ্রাম এবং মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি। তথাকথিত বুর্জোয়া বা আভিজাত্যনির্ভর অপেশাদার আড্ডার নাট্যচর্চাকে তীব্র আক্রমণ করে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই তাঁর এই রচনা।
‘চায়ের ধোঁয়া’ নামকরণের তাৎপর্য ও রূপক হিসেবে আমরা দেখতে পাই,'চায়ের ধোঁয়া' কথাটির মধ্যে উৎপল দত্ত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের অন্তঃসারশূন্যতা ও নিষ্ক্রিয়তাকে চিহ্নিত করেছেন। আর সেখানে-
চায়ের ধোঁয়ার রূপক রূপে ধোঁয়া যেমন সাময়িক, কুহেলিকাময় এবং শেষ পর্যন্ত হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, তেমনি কফি হাউস বা ড্রয়িংরুমে চা/কফির কাপে তুফান তুলে যে নাট্যচর্চা বা বিপ্লবের কথা বলা হয়-তা বাস্তবের মাটিতে কোনো প্রভাব ফেলে না।যেখানে উৎপল দত্তের বক্তব্য-
থিয়েটার চায়ের টেবিলের বায়বীয় আড্ডা নয়; থিয়েটার হলো বাস্তবের কঠিন ময়দানে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার হাতিয়ার।আসলে এই প্রবন্ধেরমূল বিষয়বস্তু ও নাট্যভাবনার প্রধান দিকসমূহ হলো-
ক) বুর্জোয়া নাট্যধারা বনাম রাজনৈতিক থিয়েটারঃউৎপল দত্ত তথাকথিত বাণিজ্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক আভিজাত্যের নাটককে বুর্জোয়া নাটক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, নাটককে শুধুমাত্র ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা ড্রয়িংরুমের পারিবারিক নাটকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।যেখানে উৎপল দত্ত বলেন-
"নাটক কেবল কতিপয় আভিজাত্যপ্রয়াসী মানুষের বিলাসদ্রব্য নয়; থিয়েটার হলো শ্রেণীসংগ্রামের এক শাণিত রাজনৈতিক অস্ত্র।"
খ) বের্টোল্ট ব্রেখট ও মেহনতি মানুষের নাট্যচেতনাঃউৎপল দত্ত জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখটের (Bertolt Brecht) 'এপিক থিয়েটার' এবং মার্কসীয় দর্শনে গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। 'চায়ের ধোঁয়া'-য় তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, নাটক দর্শকদের নিছক মোহগ্রস্ত (Illusion) করবে না, বরং তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলবে।আর এখানেও তিনি বলেন-
"আমাদের লক্ষ্য দর্শকনন্দিত হওয়া নয়, আমাদের লক্ষ্য দর্শককে শ্রেণীচেতনায় জাগ্রত করা।"
গ) গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের বিভ্রান্তি ও সমালোচনাঃষাটের দশকের গণনাট্য ও লিটল থিয়েটার আন্দোলনের নানাবিধ ত্রুটিবিচ্যুতি উৎপল দত্ত সাহসের সাথে তুলে ধরেছেন। গ্রুপ থিয়েটারগুলো যাতে চায়ের ধোঁয়ার মতো কেবল আড্ডাসর্বস্ব রূপ না নেয় এবং রাজনৈতিকভাবে পথভ্রষ্ট না হয়, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।
(ঘ) পথনাটক ও গণসংযোগঃউৎপল দত্ত বিশ্বাস করতেন, নাটককে ড্রয়িংরুম ও চারদেয়ালের মঞ্চ থেকে বের করে কারখানা গেটে, ক্ষেত-খামারে ও সাধারণ মানুষের হাটে-বাজারে নিয়ে যেতে হবে। কারণ শোষিত মেহনতি মানুষই নাটকের মূল প্রাণ।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,উৎপল দত্তের 'চায়ের ধোঁয়া' কেবল একটি সাহিত্য প্রবন্ধ বা তত্ত্বকথা নয়; এটি বাংলা থিয়েটারকে সঠিক রাজনৈতিক ও গণমুখী অভিমুখ দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ইশতেহার।যেটি-
বাংলা নাট্যচর্চায় 'চায়ের ধোঁয়া'-র গুরুত্ব অপরিসীম। এটি রূপক ও বাস্তবতার মেলবন্ধনে গঠিত এমন এক রচনা, যা আজও যেকোনো প্রগতিশীল নাট্যকর্মীকে মনে করিয়ে দেয়—শিল্প হতে হবে জীবনের জন্য, সংগ্রামের জন্য এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য।
Comments
Post a Comment