Skip to main content

রাজা নাটক।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজা নাটকের রাজা চরিত্রটির স্বরূপ বিশ্লেষণ করো। তাঁকে কেন অদৃশ্য রাখা হয়েছে? আলোচনা করো।




 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপক-সাংকেতিক নাটক ‘রাজা’ (১৯১০)-র কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন স্বয়ং ‘রাজা’। সমগ্র নাটকে তিনি কোনো দৃশ্যমান মানবীয় অবয়বে মঞ্চে আবির্ভূত হন না; কেবল অন্ধকার ঘরে রানীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। বহিরাঙ্গের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি নাটকের একমাত্র চালিকাশক্তি।

রাজা চরিত্রটির স্বরূপ বিশ্লেষণ

 * পরম সত্য ও পরমাত্মার প্রতীক: নাটকে রাজা কেবল কোনো পার্থিব কোনো রাজ্যের শাসক নন; তিনি ঈশ্বর, পরমাত্মা বা জীবন-সত্যের প্রতীক। রূপক অর্থে তিনি এমন এক পরম সত্তা, যাঁকে বাহ্যিক চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কেবল অনুভূতির গভীরে উপলব্ধি করা যায়।

 * সুন্দর ও কুরূপের অতীত (অরূপের রূপ): রাজা বহিরঙ্গে সুন্দর নন, রানীর দৃষ্টিতে তিনি রূপহীন বা কৃষ্ণবর্ণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, বাহ্যিক রূপসামগ্রী দিয়ে পরম সৌন্দর্যকে মাপা যায় না। তিনি পার্থিব ‘রূপ’-এর সীমানা ছাড়িয়ে ‘অরূপ’-এর আনন্দস্বরূপ।

 * প্রকৃতির নিয়ামক ও ন্যায়পরায়ণ: রাজা পরম ক্ষমাশীল হলেও বিধানের ক্ষেত্রে কঠোর। তিনি কাউকে জবরদস্তি করে নিজের অনুগামী করেন না। রানী সুদর্শনা যখন অহংকারের বশে তাঁকে ছেড়ে কাঞ্চিরাজের রূপের মোহে আকৃষ্ট হয়ে চলে যান, রাজা তাঁকে বাধা দেননি। তিনি রানীকে নিজের ভুল নিজে উপলব্ধি করার এবং দুঃখের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন।

 * প্রেমময় ও করুণাময়: পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন ঘটে দুঃখ ও বিরহের মধ্য দিয়ে। রাজা সুদর্শনার প্রতি গভীর অনুরাগে আবদ্ধ, কিন্তু তিনি সুদর্শনার বাহ্যিক ও অহংকারপূর্ণ রূপমোহ ভেঙে তাকে আত্মদর্শনের দিকে চালিত করেন।

রাজাকে কেন অদৃশ্য রাখা হয়েছে?

রাজাকে দৃশ্যমান কোনো চরিত্রে উপস্থাপন না করে অদৃশ্য বা অরূপ রাখার পেছনে রবীন্দ্রনাথের গভীর নাট্যভাবনা ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর ছিল:

 * সত্য ও ঈশ্বর অরূপ: রবীন্দ্রনাথের মতে, জীবনের যা গভীরতম সত্য—প্রেম, ঈশ্বর, আনন্দ—তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়। পরমাত্মা কোনো নির্দিষ্ট সাকার রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। যদি রাজাকে মঞ্চে রূপ ধারণ করে আনা হতো, তবে তিনি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তেন।

 * চোখের মোহ থেকে অন্তরের আলোয় উত্তরণ: নাটকের অন্যতম মূল বিষয় হলো রূপমোহের বিসর্জন। সুদর্শনা প্রথম দিকে বাহ্যিক রূপ ও আলো নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। রাজাকে অন্ধকার ঘরে অদৃশ্য রেখে রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন যে, চোখ দিয়ে যা দেখা যায় তা প্রায়শই মরীচিকা; অন্তরের অনুভূতি দিয়েই আসল সত্যকে উপলব্ধি করতে হয়।

 * সর্বব্যাপী উপস্থিতির প্রকাশ: রাজা যখন কোনো নির্দিষ্ট আকৃতিতে সামনে আসেন না, তখন তিনি রূপহীন হয়ে সমগ্র নাটকের বাতাসে, সুদর্শনার বিরহে ও চেতনায় সর্বব্যাপী হয়ে ওঠেন। অরূপ বলেই তিনি সর্বব্যাপী।

 * দুঃখ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লাভ: ঈশ্বরকে বা পরম সত্যকে সহজেই দৃশ্যমানভাবে পাওয়া যায় না। তাঁকে পেতে হলে দুঃখের কঠোর তপস্যা পার হতে হয়। অদৃশ্য রাজা চরিত্রটি জীবাত্মা ও পরমাত্মার এই আধ্যাত্মিক বিরহ-মিলনের পথটিকেই নির্দেশ করে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘রাজা’ নাটকে রাজা কোনো রক্তমাংসের মানুষ নন—তিনি অরূপের রূপ, যাঁকে কেবল অহংকারমুক্ত, বিরহ-তপ্ত ও ভালোবাসায় সিক্ত হৃদয়েই লাভ করা যায়।


Comments