শিক্ষার লক্ষ্যের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়,প্রথম সেমিস্টার, এডুকেশন মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শিক্ষা একটি উদ্দেশ্যমুখী, গতিশীল এবং সচেতন সামাজিক প্রক্রিয়া। যেকোনো তাৎপর্যপূর্ণ কাজের পেছনে যেমন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে, তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রটিতেও একটি স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা অপরিহার্য। লক্ষ্যহীন শিক্ষা কান্ডারীহীন নৌকার মতো, যা শিক্ষার্থীকে গন্তব্যহীন ভাসমান অবস্থায় নিয়ে যায় এবং শিক্ষার সমগ্র প্রক্রিয়াকে নিষ্ফল করে তোলে।আসলে-
শিক্ষা দর্শনে শিক্ষার লক্ষ্য হলো সেই দিক-নির্ণায়ক কম্পাস, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই সঠিক পথের দিশা দেখায় এবং ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে সমাজোপযোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা-
শিক্ষার লক্ষ্য কেন প্রয়োজন, তা সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষা দর্শনের আলোকে বিস্তারিতভাবে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১) শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণে সাহায্য করে।শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হবে, তার ওপর ভিত্তি করেই পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রস্তুত করা হয়। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে নির্ধারণ করা সহজ হয় যে শিক্ষার্থীকে কোন কোন বিষয় পড়ানো হবে, কোন বয়স অনুযায়ী কোন বিষয়বস্তু উপযোগী এবং কোন ধরণের শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
২)শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঠিক দিক-নির্দেশনা।একটি কান্ডারীহীন নৌকা যেমন সমুদ্রে দিক হারিয়ে ফেলে, লক্ষ্যহীন শিক্ষাও শিক্ষার্থীকে বিপথে পরিচালিত করতে পারে। শিক্ষার লক্ষ্য থাকলে শিক্ষকের ভূমিকা স্পষ্ট হয়। তিনি বুঝতে পারেন শিক্ষার্থীকে কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে হবে।আবার -
শিক্ষার্থী জানতে পারে সে কেন পড়াশোনা করছে, যা তার মধ্যে শেখার প্রতি আগ্রহ ও অভ্যন্তরীণ অনুপ্রেরণা (Motivation) তৈরি করে।
৩)উপযুক্ত শিক্ষা পদ্ধতি ও উপকরণের ব্যবহার।শিক্ষার লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে কোন প্রযুক্তি, শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বা মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করবেন তা সঠিকভাবে নির্বাচন করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, লক্ষ্য যদি হয় শিক্ষার্থীকে কারিগরি দিক থেকে দক্ষ করা, তবে শ্রেণীকক্ষে কেবল তত্ত্বীয় আলোচনার বদলে ব্যবহারিক পদ্ধতির ওপর বেশি জোর দিতে হবে।
৪) ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ ও সুষম বিকাশ। শিক্ষার লক্ষ্য কেবল বইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তির দৈহিক, মানসিক, আবেগীয়, নৈতিক ও সামাজিক-এই সমস্ত দিকের সুষম বিকাশ ঘটানো শিক্ষার লক্ষ্য থাকার ফলেই সম্ভব হয়। লক্ষ্য স্থির থাকলে শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটে।
৫)সময়, শক্তি ও সম্পদের অপচয় রোধ।সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সময় ও শক্তি ব্যয় করতে পারে। শিক্ষার লক্ষ্য স্থির থাকলে শিক্ষার প্রতিটি পর্যায় একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ, শিক্ষার্থীদের সময় ও মানসিক শক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
৬)সামাজিক পরিবর্তন ও প্রগতির পথপ্রদর্শক।সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের চাহিদাও পরিবর্তিত হয়। শিক্ষার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে তা সমাজের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৃষ্টিগত চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে নাগরিক তৈরি করতে পারে। এটি সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করে এবং প্রগতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
৭) শিক্ষার কার্যকারিতা মূল্যায়ন।শিক্ষাদান প্রক্রিয়া কতটা সফল হলো তা পরিমাপ করার জন্য একটি মাপকাঠি প্রয়োজন। শিক্ষার লক্ষ্যই সেই মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। পরীক্ষা বা মূল্যায়নের মাধ্যমে বোঝা যায় যে শিক্ষার পূর্বে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলি শিক্ষার্থী কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে।
মোটকথা হলো,শিক্ষার লক্ষ্য হলো শিক্ষালব্ধ জ্ঞানকে জীবনের সার্বিক উপযোগী করে তোলার এক মূল চাবিকাঠি। লক্ষ্য ছাড়া শিক্ষা হলো উদ্দেশ্যহীন শ্রম মাত্র।
Comments
Post a Comment