Skip to main content

আস্তিক ও নাস্তিক দর্শনের পার্থক্য লেখো।

আস্তিক ও নাস্তিক দর্শনের পার্থক্য লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।

           আমরা জানি যে,ভারতীয় দর্শনচিন্তার এক বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জগত রয়েছে।এই দর্শনের মূল ধারাগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয় আস্তিক এবং নাস্তিক দর্শন। সাধারণ লৌকিক অর্থে 'আস্তিক' বলতে ঈশ্বরবিশ্বাসী এবং 'নাস্তিক' বলতে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী বোঝানো হলেও, ভারতীয় দর্শনের পরিভাষায় এই শব্দদ্বয়ের অর্থের গভীরতা অনেক বেশি। তবে-

       এখানে বিভাজনের প্রধান মাপকাঠি হলো 'বেদ'। যে দর্শন সম্প্রদায় বেদের প্রামাণ্য ও বেদবিহিত কর্মপদ্ধতিকে অভ্রান্ত ও পরম সত্য বলে স্বীকার করে, তারা আস্তিক দর্শন; আর যারা বেদের প্রামাণ্যকে অস্বীকার করে বা তার বিরোধী মত পোষণ করে, তারা নাস্তিক দর্শন। এই বিভাজনই ভারতীয় দর্শনের মতবাদগত বিন্যাস ও চিন্তাধারার পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে আস্তিক ও নাস্তিক  দর্শনের যে পার্থক্যগুলি আমরা দেখতে পাই তা হলো-

 ১) বেদের প্রামাণ্যকে যারা স্বীকার করেন তাঁরা আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় নামে পরিচিত ।কিন্তু-

      •যারা বেদের প্রামাণ্যকে অস্বীকার করে তাঁরা নাস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় নামে পরিচিত ।

২) আস্তিক দর্শন প্রমাণতত্ত্ববেদ বা শব্দকে জ্ঞানের অন্যতম প্রধান প্রমাণ বলে মনে করে।কিন্তু-

     • নাস্তিকরা প্রত্যক্ষ এবং অনুমানকে জ্ঞানের মূল ভিত্তি মনে করে।

৩) আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় হলো-ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা, ও বেদান্ত।কিন্তু-

      • নাস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় হলো-চার্বাক, জৈন এবং বৌদ্ধ দর্শন।

৪)ঈশ্বরবাদ অধিকাংশ আস্তিক দর্শন (ন্যায়, যোগ, বেদান্ত) ঈশ্বর স্বীকার করে।কিন্তু-

       •বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন ঈশ্বর স্বীকার করে না, চার্বাকও জড়বাদী।

৫) আস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় পরকাল বা আত্মা ও পরলোকের অস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাসী।কিন্তু -

      • নাস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায়ের মধ্যে চার্বাক আত্মা মানে না; বৌদ্ধ ও জৈনদের আত্মার ধারণা ভিন্ন।

৬) আস্তিকরা  ধর্মীয় ভিত্তিশাস্ত্রীয় বিধি-নিষেধ ও যজ্ঞাদিকে ধর্মের অঙ্গ মনে করে।কিন্তু-

    • নাস্তিক দার্শনিক সম্প্রদায় শাস্ত্রীয় অলৌকিকতার চেয়ে নৈতিকতা ও যুক্তিতে বেশি বিশ্বাসী।

৭) আস্তিক দর্শনে জ্ঞানের উৎসজ্ঞানতত্ত্বের কেন্দ্রে শাস্ত্র বা বেদকে স্থাপন করা হয়।কিন্তু-

    • নাস্তিক দর্শনে জ্ঞানতত্ত্বের কেন্দ্রে লৌকিক অভিজ্ঞতা বা যুক্তিকে রাখা হয়।

৮) আস্তিক দর্শনে মুক্তির ধারণা বেদের নিয়ম মেনে মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করা।কিন্তু-

       • নাস্তিক দর্শন মতে প্রচেষ্টায় দুঃখমুক্তি বা নির্বাণ লাভ করা সম্ভব ।

৯) আস্তিক দার্শনিকরা ইতিহাস ও ঐতিহ্য সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।কিন্তু-

    • নাস্তিক দার্শনিকরা বৈদিক ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চিন্তার ধারক।

১০) আস্তিক দর্শন অনুসারে সামাজিক প্রভাবসমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও বর্ণাশ্রমকে সমর্থন করে।কিন্তু-

     • নাস্তিক দর্শনে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে তারা সংস্কারবাদী।

       পরিশেষে বলা যায় যে,আস্তিক ও নাস্তিক দর্শনের এই বিভাজন কেবল তাত্ত্বিক বিবাদ নয়, বরং সত্য অনুসন্ধানের দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আস্তিক দর্শনগুলো বেদের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব ও ঐতিহ্যগত ধারাকে আশ্রয় করে মোক্ষ লাভের পথ নির্দেশ করেছে। অন্যদিকে, নাস্তিক দর্শনগুলো প্রথাগত অন্ধবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ প্রমাণকে সত্যের মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তবে-

            উভয় ধারার পদ্ধতি ভিন্ন, তবুও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিন্ন—জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি এবং পরম সত্যের অনুসন্ধান। ভারতীয় দর্শনের এই উদারতা ও বৈচিত্র্যই প্রমাণ করে যে, সত্যে পৌঁছানোর পথ একটি নয়, বরং অসংখ্য, এবং চিন্তার স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদই এই দর্শনের মূল প্রাণশক্তি।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং "Shesher Kabita Sundorbon" YouTube channel SAMARESH Sir





Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

চতুর্থ সেমিস্টার জেনারেল ইতিহাস ছোট প্রশ্ন ২০২১

 *১) সুজাউদ্দৌলা কে ছিলেন বা মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর কে বাংলার নবাব হন?  উত্তর - সুজা উদ্দৌলা আয়ুধের সুবেদার নবাব ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তার জামাতা বাংলার নবাব  হন ১৭৫৪-১৭৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত। নবাব থাকাকালীন তিনি বক্সারের যুদ্ধ এবং পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। *২) কোন সালে রেগুলেটিং আইন জারি করা হয়েছিল? উত্তর - ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্নীতি দূরীকরণ, গঠন বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং আইন প্রণয়ন করেন। আর সেই আইনে বলা হয় বাংলা বোম্বাই ও মাদ্রাজে ১ করে কাউন্সিল থাকবে। *৩) শ্রী রঙ্গপত্তমের সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী কারা কারা ছিলেন ?কখন এই সন্ধিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল? উত্তর - তৃতীয় ইঙ্গ মহীশূর যুদ্ধের অবসান হয়েছিল শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধির দ্বারা। আর এই সন্ধিতে ঠিক হয় টিপু সুলতান ইংরেজদের তিন কোটি টাকা এবং জামিন স্বরূপ তার দুই পুত্রকে দিতে বাধ্য হবেন। এছাড়া বিজিত অঞ্চল ইংরাজ, মারাঠা ও নিজামের মধ্যে বন্টিত হল। যে সন্ধির দুটি পক্ষ ছিল একদিকে ছিলেন টিপু সুলতান এবং অপরদিকে ছিলেন ইংরেজ। সময়কালটি ছি...